ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৬:৫২:৩৫ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

ধ্রুব এষ: রঙে-রেখায় এক অনন্য প্রেরণার নাম

আইরীন নিয়াজী মান্না

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৭:০১ পিএম, ৬ মে ২০২৬ বুধবার

দেশের কিংবদন্তি প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষ।

দেশের কিংবদন্তি প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষ।

জীবনের পথচলায় কিছু মানুষের সান্নিধ্য আশীর্বাদের মতো এসে ধরা দেয়। তারা শুধু কাজের সহযাত্রী নন, হয়ে ওঠেন অনুপ্রেরণার উৎস, নির্ভরতার জায়গা, আত্মিক সম্পর্কের এক উজ্জ্বল নাম। আমার জীবনে তেমনই একজন মানুষ ধ্রুব এষ।

বাংলাদেশের প্রচ্ছদশিল্পের জগতে তিনি এক কিংবদন্তি। রঙ, রেখা আর কল্পনার অসাধারণ মিশেলে তিনি এঁকেছেন হাজার হাজার বইয়ের প্রচ্ছদ। প্রায় চল্লিশ হাজারেরও বেশি প্রচ্ছদ অঙ্কনের বিরল কৃতিত্ব তাকে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতা। কিন্তু তার শিল্পীসত্তার বিশালতার চেয়েও যে বিষয়টি আমাকে বেশি মুগ্ধ করে, তা হলো তার অসাধারণ মানবিকতা, স্নেহশীলতা এবং সহজ-সরল ব্যক্তিত্ব।

ধ্রুব এষের সঙ্গে আমার পরিচয় সেই কিশোরী বয়সে। তখনও জীবন, সাহিত্য, সম্পাদনা—সবকিছুই আমার কাছে শেখার বিষয়। সেই সময় থেকেই তাকে দেখেছি এক নিবেদিত শিল্পী হিসেবে, যার হাতে যেন রঙ কথা বলে, রেখা প্রাণ পায়।

শিল্পী হিসেবে তার খ্যাতি তখনই প্রতিষ্ঠিত। অথচ সেই উচ্চতায় থেকেও তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য রকম বিনয়ী। নতুনদের উৎসাহ দেওয়া, তাদের পাশে দাঁড়ানো, কাজের বিষয়ে আন্তরিক পরামর্শ দেওয়া—এসব যেন তার সহজাত স্বভাব।

আমার জীবনের বড় প্রাপ্তিগুলোর একটি হলো, তার অপার স্নেহ পাওয়া।

আজ প্রায় তিন দশক ধরে তিনি আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত শিশু-কিশোরদের প্রিয় পত্রিকা কিশোর লেখার সঙ্গে যুক্ত।

এই দীর্ঘ সময়জুড়ে পত্রিকাটির প্রচ্ছদে তার তুলির ছোঁয়া লেগেছে। প্রতি সংখ্যার প্রচ্ছদ যেন হয়ে উঠেছে আলাদা এক শিল্পভুবন—কখনো রঙিন স্বপ্ন, কখনো কাব্যিক আবেশ, কখনোবা শিশুমনের বিস্ময়কে ধারণ করা এক মায়াময় জানালা।

কিশোর লেখার পাঠকেরা হয়তো প্রথমেই যে বিষয়টির প্রেমে পড়ে, তার একটি বড় অংশজুড়ে থাকে ধ্রুব এষের প্রচ্ছদ।
একটি শিশু-কিশোর পত্রিকার প্রচ্ছদ কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি পাঠকের কল্পনার দরজা খুলে দেয়। সেই দরজা খোলার কাজটি তিনি বছরের পর বছর ধরে এমন নিষ্ঠা আর ভালোবাসা দিয়ে করেছেন, যা সত্যিই বিরল।

শুধু প্রচ্ছদ অঙ্কনেই নয়, লেখক হিসেবেও তিনি কিশোর লেখাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তার লেখায় যেমন শিল্পবোধ, তেমনি আছে গভীর জীবনদর্শন। তার লেখা পড়লে মনে হয়, তিনি শুধু তুলিতে আঁকেন না—শব্দ দিয়েও ছবি আঁকেন।

আমার সম্পাদনার নানা সংকটময় সময়ে তার সহযোগিতা পেয়েছি নিঃসংকোচে। কখনো কোনো সংখ্যার প্রচ্ছদ নিয়ে দুশ্চিন্তা, কখনো হঠাৎ সময়স্বল্পতা—প্রতিবারই তাকে পেয়েছি নির্ভরতার জায়গায়।

একটি ফোন, একটি অনুরোধ—আর তার পরেই অবলীলায় বলে উঠেছেন, “হয়ে যাবে।” এই “হয়ে যাবে” শব্দদুটি শুধু আশ্বাস ছিল না; ছিল এক ধরনের ভালোবাসা, আস্থা আর দায়িত্ববোধের প্রকাশ।

অনেক সময় ভেবেছি, এত ব্যস্ততার মাঝেও কীভাবে একজন মানুষ এত আন্তরিক থাকতে পারেন! সম্ভবত এটাই প্রকৃত বড় মানুষের পরিচয়। ধ্রুব এষকে কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, শিল্পী হওয়া শুধু দক্ষতার বিষয় নয়; এটি হৃদয়েরও বিষয়।

তার শিল্পবোধ যেমন পরিশীলিত, তেমনি তার মনও অসাধারণ রকম নির্মল। তিনি কখনো নিজের কৃতিত্বের ভারে নত হননি; বরং চারপাশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন, এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছেন।

আমার ব্যক্তিগত জীবনে তার স্নেহের স্পর্শ অনেকবার আমাকে আলো দেখিয়েছে। কখনো পরামর্শ দিয়ে, কখনো উৎসাহ দিয়ে, কখনো শুধু মমতামাখা কয়েকটি কথা বলে তিনি পাশে থেকেছেন।

এই দীর্ঘ সম্পর্কের পথচলায় তাকে আমি শুধু একজন শিল্পী হিসেবে দেখিনি; দেখেছি বড় ভাইয়ের মতো, অভিভাবকের মতো, একজন আন্তরিক শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে।

আজ যখন কিশোর লেখার পুরোনো সংখ্যাগুলো হাতে নিই, একের পর এক প্রচ্ছদ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। প্রতিটি প্রচ্ছদ যেন সময়ের একেকটি স্মারক। সেখানে আছে শিশুদের স্বপ্ন, কল্পনা, উচ্ছ্বাস—আর আছে ধ্রুব এষের তুলির অমলিন ছাপ।

ভাবতে ভালো লাগে, আমাদের এই দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রার সঙ্গে তার শিল্পীসত্তা এমন নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। জীবনে কিছু সম্পর্কের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন।

ধ্রুব এষের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতাও তেমনই। তার স্নেহ, সহযোগিতা, ভালোবাসা এবং অবিচল সমর্থন আমার সাহিত্য-সম্পাদনার পথকে অনেক সহজ করেছে। তিনি শুধু কিশোর লেখার প্রচ্ছদশিল্পী নন, তিনি এই পত্রিকার আত্মিক পরিমণ্ডলেরও অংশ।

ধ্রুব এষের মতো মানুষ আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সম্পদ। আর আমার ব্যক্তিজীবনে—তিনি এক অমূল্য প্রাপ্তি, এক উজ্জ্বল স্মৃতি, এক অনন্ত কৃতজ্ঞতার নাম।

আইরীন নিয়াজী মান্না: শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক। সম্পাদক-কিশোর লেখা ও উইমেননিউজ২৪.কম।