অপর্ণা সেন: সময়কে ছাপিয়ে যাওয়া এক শিল্পিত আলোর নাম
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৪:০৫ পিএম, ৯ মে ২০২৬ শনিবার
অপর্ণা সেন। ফাইল ছবি।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের উপস্থিতি শুধু অভিনয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; তারা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতিনিধি, এক বিশেষ শিল্পদর্শনের বাহক। সেই বিরল কজনের অন্যতম অপর্ণা সেন। অভিনেত্রী, নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, লেখক ও সমাজমনস্ক বুদ্ধিজীবী—প্রতিটি পরিচয়ে তিনি সমান উজ্জ্বল।
১৯৪৫ সালের ২৫ অক্টোবর ভারতের কলকাতায় জন্ম নেওয়া অপরণা সেনের বেড়ে ওঠা ছিল এক সাংস্কৃতিক আবহে। তার বাবা চিদানন্দ দাসগুপ্ত ছিলেন খ্যাতিমান চলচ্চিত্র সমালোচক ও ভারতীয় চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের পথিকৃৎ। মা সুপ্রিয়া দাসগুপ্ত ছিলেন সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। ফলে ছোটবেলা থেকেই বই, শিল্প, সিনেমা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার পরিবেশে তার শিল্পীসত্তার বিকাশ ঘটে।
মাত্র কিশোরী বয়সেই চলচ্চিত্রে অভিষেক। কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যাজিত রায়ের-এর তিনকন্যা-তে অভিনয়ের মাধ্যমে পর্দায় তার যাত্রা শুরু। শুরু থেকেই তার অভিনয়ে ছিল স্বাভাবিকতা, সংযম আর গভীর অভিব্যক্তির ছাপ, যা তাকে দ্রুত আলাদা করে তোলে।
পরবর্তী সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রে একের পর এক স্মরণীয় কাজের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বসু পরিবার, আকাস কুসুম, মেমসাহেব, জন অরণ্যসহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তার অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
তবে অপরণা সেনের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত তার নির্মাতা সত্তা। ১৯৮১ সালে ৩৬ চৌরুঙ্গি লেন নির্মাণের মাধ্যমে পরিচালনায় অভিষেক ঘটে। ছবিটি জাতীয় পুরস্কারসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা পায়। এরপর পরমা, যুগান্ত, মিস্টার এন্ড মিসেস আয়ার, ফিফটিন পার্ক অ্যাভিনিউ, ঘরে বাইরে আজ-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি ভারতীয় সিনেমায় নিজস্ব এক ভাষা তৈরি করেন।
তার নির্মাণশৈলীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো নারীর মনোজগত, সামাজিক সংকট, সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন এবং মানবিক জটিলতাকে সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরা। তার সিনেমায় নারী চরিত্র কখনও নিছক অলংকার নয়; তারা প্রশ্ন তোলে, প্রতিবাদ করে, নিজের অস্তিত্বের জায়গা খোঁজে।
বর্তমানে ৮০ বছর বয়সেও অপরণা সেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সক্রিয়। বিভিন্ন আলোচনা, সাহিত্যসভা ও চলচ্চিত্রবিষয়ক অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি এখনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলোতে তিনি জানিয়েছেন, নিয়মিত যোগব্যায়াম করেন এবং নিজেকে মানসিকভাবে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করেন।
শারীরিক উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি হলেও শিল্পীসত্তার উচ্চতায় তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক তারকার আলো ফিকে হয়ে যায়, কিন্তু অপরণা সেন যেন ক্রমেই আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন।
বাংলা সিনেমার পর্দায় তিনি শুধু একজন অভিনেত্রী নন; তিনি এক বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থিতি, এক সাহসী কণ্ঠ, এক অনন্য নির্মাণদর্শন। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি প্রমাণ করে চলেছেন—শিল্প মানে শুধু বিনোদন নয়, শিল্প মানে সমাজকে প্রশ্ন করা, ভাবতে শেখানো, আর মানুষের ভেতরের সত্যকে খুঁজে বের করা।
অপরণা সেন তাই কেবল একটি নাম নয়, বাংলা সংস্কৃতির এক জীবন্ত অধ্যায়।
