ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৫:৪৮:২৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

রাজিয়া বানু: দেশের সংবিধান রচনা কমিটির একমাত্র নারী সদস্য

অনলাইন ডেস্ক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:১৭ পিএম, ১১ মে ২০২৬ সোমবার

রাজিয়া বানু

রাজিয়া বানু

বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষের অবদান আছে, যাদের নাম খুব বেশি উচ্চারিত না হলেও তাদের কাজ জাতির ভিত্তি নির্মাণে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। রাজিয়া বানু তেমনই এক আলোকিত নাম। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির একমাত্র নারী সদস্য হিসেবে তিনি শুধু ইতিহাসের অংশই নন, তিনি নারী নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার এক অনন্য প্রতীক। এই কৃতী নারীকে স্মরণ করা মানে বাংলাদেশের রাষ্ট্র নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুন করে ফিরে দেখা।

পারিবারিক পরিচয় ও বংশপরিচয়
রাজিয়া বানুর জন্ম ২৪ জুন ১৯২৬ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় । তাঁর পিতা এএইচএম ওয়াজীর আলী ছিলেন প্রথম বাঙালি মুসলমান এসডিও এবং শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের ভাগ্নে ও জামাতা।
মাতা নাফিসা বেগম ছিলেন বাংলার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কন্যা । রাজিয়া বানুর পরিবারে রাজনৈতিক ঐতিহ্য ছিল গভীরভাবে প্রোথিত। রাজনীতিবিদ এ কে ফায়জুল হক ছিলেন তাঁর মামা (uncle), যিনি ছিলেন শেরে বাংলার পুত্র এবং নাফিসা বেগমের ভাই ।

শিক্ষাজীবন
কলকাতার লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর রাজিয়া বানু আশুতোষ কলেজ থেকে বি.এ (অনার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন । শিক্ষায় তাঁর এই অগ্রগামী ভূমিকা সেই যুগের প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

রাজনৈতিক জীবন
১৯৫৪ সালে রাজিয়া বানু কৃষক শ্রমিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে পূর্ববঙ্গ আইনসভায় সদস্য নির্বাচিত হন । এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের শিক্ষা বিষয়ক সংসদীয় সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ।
পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দেন । ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের নারীদের জন্য সংরক্ষিত সাতটি আসনের একটিতে আওয়ামী লীগের মনোনীত এমএনএ নির্বাচিত হন।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে ঐতিহাসিক ভূমিকা
১১ এপ্রিল ১৯৭২ সালে ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য ৩৪ সদস্যের যে কমিটি গঠিত হয়, সেখানে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন রাজিয়া বানু। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
রাজিয়া বানুকে সংবিধান প্রণয়ন কমিটিতে যুক্ত করার পেছনে একাধিক কারণ ছিল — তিনি বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় সমান পারদর্শী ছিলেন এবং সংসদীয় বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন।
সংবিধানকে নারীবান্ধব করে তুলতে সংবিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত খসড়া কমিটির একমাত্র নারী সদস্য হিসেবে রাজিয়া বানু বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ, দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং চলাফেরার স্বাধীনতা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তিকরণেও তাঁর বিশেষ অবদান ছিল।

জাতীয় সংসদে দায়িত্ব
রাজিয়া বানু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪ থেকে সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁর দায়িত্ব পালনকাল ছিল ৭ মার্চ ১৯৭৩ থেকে ৬ নভেম্বর ১৯৭৬ পর্যন্ত।

ব্যক্তিগত জীবন
১৯৪৩ সালে তিনি সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মাহবুবুর রহমান ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের যুগ্ম সচিব এবং বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের সচিব। তাঁদের পরিবারে ছিল দুই কন্যা ও তিন পুত্র সন্তান।
১৯৯৮ সালের ১০ মে ঢাকার গুলশানের কার্ডিও কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক, বিশেষ করে সাংবিধানিক ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে রাজিয়া বানুর কথা না বললে। তিনি শুধু একজন নারী রাজনীতিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন রাষ্ট্রগঠনের এক সাহসী কারিগর। বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
নারী অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাজিয়া বানুর অবদান আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের নারী নেতৃত্বের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস।শ্রদ্ধাঞ্জলি রাজিয়া বানু ।

যে সময়ে নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ছিল বিরল, সেই সময়েই রাজিয়া বানু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন দক্ষ ও দূরদর্শী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। ১৯৫৪ সালে তিনি পূর্ববঙ্গ আইনসভায় সদস্য নির্বাচিত হন। এটি শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না; বরং সে সময়কার সামাজিক বাস্তবতায় নারীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে একটি সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে দাঁড় করানো ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল গঠিত হয় ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটি। এই ঐতিহাসিক কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য হিসেবে যুক্ত হন রাজিয়া বানু।

কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ড. কামাল হোসেন। তার নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিই বাংলাদেশের সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন করে। সেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অংশীদার ছিলেন রাজিয়া বানু।

বাংলাদেশের সংবিধান কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার একটি আইনি দলিল নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে নির্মিত এক রাষ্ট্রদর্শনের ঘোষণা। এই দলিল প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত থেকে রাজিয়া বানু ইতিহাসে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন।

তার এই ভূমিকা ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তখনকার সময়ে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত। রাজিয়া বানুর উপস্থিতি প্রমাণ করেছিল, নারীরা শুধু রাজনীতির দর্শক নন; রাষ্ট্র নির্মাণের সক্রিয় কারিগরও।

১৯৭৩ সালে তিনি প্রথম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য হিসেবে নারী অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন।

ব্যক্তিজীবনে রাজিয়া বানু ছিলেন প্রচারবিমুখ, মার্জিত ও চিন্তাশীল। তিনি বিশ্বাস করতেন, নেতৃত্বের আসল শক্তি কথার চেয়ে কাজে। রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নারী শিক্ষার প্রসার এবং সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও ছিলেন সোচ্চার। মৃত্যুর বহু বছর পরও বাংলাদেশের সংবিধানের ইতিহাসে তার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

আজ যখন বাংলাদেশের নারীরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা ও রাজনীতিতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করছেন, তখন মনে রাখা জরুরি—এই পথ নির্মাণে রাজিয়া বানুর মতো অগ্রজ নারীদের অবদান ছিল মৌলিক।

আজ আমাদের শুধু একজন রাজনীতিককে স্মরণ করায় না; এটি মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের অনেক বড় পরিবর্তনের পেছনে থাকে নীরব অথচ শক্তিশালী কিছু মানুষের অবদান। রাজিয়া বানু ছিলেন তেমনই একজন।

বাংলাদেশের সংবিধানের পাতায়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এবং নারী নেতৃত্বের ইতিহাসে তিনি চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন।