ঢাকা, মঙ্গলবার ২১, জুলাই ২০২৬ ২৩:৫৫:৪৫ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

দেশে কমছে না ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম

প্রকাশিত : ০৬:৩৪ পিএম, ১১ জুন ২০১৫ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৩:৩১ পিএম, ১৩ জুন ২০১৫ শনিবার

Child-workers-600x342মাজেদুল হক তানভীর, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম, ঢাকা : সিহাব বয়স ১২। পুরোনো ঢাকার একটি ওয়েল্ডিং এর দোকানে কাজ করে।  ভোর থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত কাজ করে সে। এক মাসে সে বেতন পায় এক হাজার টাকা। আয়ের অধিকাংশ টাকাই সে পাঠায় তার বাড়িতে। ফার্মগেট মোড়ে ‘টেকনিক্যাল গাবতলী’  বলে যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিল রিযাজ। ১১ বছর বয়সী রিয়াজ সারাদিন বাসের হেল্পারি করে। কথা বলে জানা যায়, ভোর ছয়টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ডিউটি করে সে। তিন বেলা খাওয়া ও প্রতিদিন ২০ টাকা করে পায় সে। বাস চলার মাঝে মাঝে মাঝেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে। কিন্তু সংসার চালানোর প্রয়োজনে তাকে এই কাজ করতে হয়। পাঁচ ভাইবোন আর মা, এই  ছয়জনের বিরাট সংসারের হাল ধরেছে সে তার বড় ভাই। মৌচাক মার্কেটের একটি টেইলারিং এর দোকানে শাড়িতে চুমকি জরির কাজ করে  ১৪ বছরের সাহানা (ছদ্মনাম)। গত চার বছর ধরে এই কাজ করছে সে। দীর্ঘদিন ধরে এই সুক্ষ্ম কাজ করতে গিয়ে এখন তার চোখে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বাবার অসুস্থতার কারণে সংসার চালাতে হয় তাকেই। সারা মাসে বেতন পায় ১২শ’ টাকা। এই টাকাতেই চালাতে হয় তাকে ছয়জনের সংসার।  প্রতিদিন তাকে কাজ করতে হয় ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা। image_143_4052সিহাব, রিয়াজ, সাহানার মতো প্রতিদিন ঢাকা শহরে শ্রম বিক্রি করছে অসংখ্য শিশু। প্রতিদিনই রাজধানীসহ সারাদেশে বাড়ছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা। বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায় দেশের প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে একজন শ্রমিক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও’র সাম্প্রতিক এক তথ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশের শিশু শ্রমিকরা প্রায় ৩শ ৪৭ ধরণের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে ৪৭ ধরণের কাজকে ঝুঁকিপহৃর্ণ এবং ১৩ ধরনের কাজকে অত্যন্ত ঝুঁকিপহৃর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে অত্যন্ত ঝুঁকিপহৃর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে ব্যাটারিসহ বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক কারখানায় শিশুশ্রম, ট্যানারি শিল্প, যৌন কর্ম, বিড়ি ও তামাক ফ্যাক্টরি, পরিবহন খাত, ময়লা আবর্জনা সংগ্রহ করা, গ্লাস ফ্যাক্টরি, লেদ মেশিন ও ওয়েল্ডিংয়ের কাজ, অটোমোবাইল কারখানা, লবন কারখানা, রিক্সা ও ভ্যান চালক, কাঠ মিস্ত্রীর কাজ, জুয়েলারী শিল্পে কারিগরের কাজ, চাল ও মসলার কারখানার কাজ, ম্যানুফ্যাকচারীং কারখানার কাজ, মাদক দ্রব্য বিক্রি ও অস্ত্র বহন, চোরাচালানি ইত্যাদি। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, দেশের শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে ১৩ লাখ শিশু। যার শতকরা হার মোট শিশু শ্রমিকের ৪১ শতাংশ। এছাড়া শহুরে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৭ লাখ এবং গ্রামীণ শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ২৪ লাখ ৭০ হাজার। মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে তারা এসব কাজ করছে। তাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। এই শিশুদের মাসিক আয় গড়ে ৯৭৭ টাকা। এর মধ্যে ছেলে শিশু শ্রমিক পায় ৯৯২ টাকা এবং মেয়ে শিশু শ্রমিক পায় ৮৬৪ টাকা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দারিদ্র, অশিক্ষা, পারিবারিক বিচ্ছেদ, পিতার বহু বিবাহ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নানা রকম প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে সৃষ্ট দুরাবস্থার কারণে দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এছাড়াও পিতা বা উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, অনাকর্ষনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা, শহরে বস্তি বিস্তার, বড় পরিবার ইত্যাদি কারণেও শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন তারা। childWorkerবাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী  ৪ কোটি ২৪ লাখ শিশুর মধ্যে ২ কোটি ২৭ লাখ ছেলে এবং  ১ কোটি ৯৭ লাখ মেয়ে শিশু। এদের মধ্যে ৭৪ লাখ শিশু অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত। এদের মধ্যে ছেলে শিশু ৫৪ লাখ এবং মেয়ে শিশু ২০ লাখ। সমীক্ষায় আরো দেখা যায়, আইএলও ঘোষিত বিশ্বমান ও কর্মঘন্টার ভিত্তি অনুযায়ী ৭৪ লাখ শিশুর মধ্যে ৩২ লাখ শিশু শ্রমিক। এদের মধ্যে ২৫ লাখ ছেলে এবং ৭ লাখ মেয়ে শিশু। এসব শিশুদের মাত্র ৬ দশমিক ৭ ভাগ শিশু প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে এবং ৯৩ দশমিক ৩ ভাগ শিশু অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে শ্রম দিচ্ছে। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের শিশু আইনে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত একজন মানুষকে শিশু হিসেবে চিহিক্রত করা হয়েছে। ন্যাশনাল চিল্ড্রেন পলিসি ১৪ বছর পর্যন্ত মানুষকে শিশু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। শিশু শ্রম নিরসনের জন্য ১৯৭৩ সালের জুন মাসে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৫৮তম অধিবেশনে ন্যূনতম বয়স সংক্রান্ত কনভেনশন ১৩৮ গৃহীত হয়। এই কনভেনশনে ন্যূনতম বয়স ১৫ বছর ঘোষণা করা হয়। যে সব কাজ শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সেক্ষেত্রে শ্রমে নিয়োগের বয়স কোনো অবস্থাতেই ১৮ বছরের কম হবে না। হালকা ধরনের কাজের ক্ষেত্রে ১৩ থেকে ১৫ বছরের ছেলেমেয়েদের নিয়োগ করা যাবে। অথচ দেশের মোট শিশুর প্রায় ২৫ ভাগ নিয়োজিত রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা শহরের শিশু শ্রমিকরা মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক বেসরকারী, গাহস্থ্য ও গার্মেন্টস খাত তিনটি খাতে শ্রম দিচ্ছে।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন পারিবারিক ও আর্থসামাজিক বিভিন্ন কারণে ৬ থেকে ৭ বছর বয়সেই বাংলাদেশের শিশুরা জীবন ধারণের জন্য শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে স্টাটাস, পুঁজি, বাসস্থান, শিক্ষা, বিনোদন ও নিরাপত্তা লাভের মৌলিক অধিকার থেকে এসব শিশুরা বঞ্চিত। তারা মনে করছেন, রাত জেগে কাজ করা, অত্যাধিক কাজের চাপ, অবহেলা, পর্যাপ্ত আলো বাতাসের অভাব, প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানীয় জলের অভাব, আগুনের ব্যবহার, ময়লা, নোংরা ও অস্বস্তিকর কাজের পরিবেশ, ধারালো যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার, কম মজুরি, মালিকের দূর্ব্যবহার, পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাব এবং দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার ফলে শারীরীক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে এসব শিশুরা। কেটে যাওয়া, ক্ষত, আগুনে পোড়াসহ নানা রকম ইনজুরি ও ইনফেকশন, চর্ম রোগ, চোখের সমস্যা, শ্রবণ সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, পেটের পিড়া,  মাথা ব্যাথাসহ নানা রকম জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শিউলি শামস বলেন, অপরিচ্ছন্ন-অস্বস্তিকর পরিবেশ, মালিকের দুর্ব্যবহার ও মারধর, বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রম এবং প্রয়োজনীয় খাবারের অভাবে এসব শিশুরা দ্রুত নানা রকম রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এধরনের কাজ করতে যেয়ে মানসিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে অল্প বয়সেই ওরা বুড়িয়ে যাচ্ছে। অনেকেই দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় ভোগে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন আইনের অপব্যবহার ও আইন অমান্য করা, আইন সম্পর্কে না জানা, অজ্ঞতা এবং অসচেতনতা, সরকারের পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের অভাব এবং সস্তা ও বিনা পারিশ্রমিকে শিশু শ্রমিক পাওয়ার কারণে দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে শিশু বিকাশ কেন্দ্রেরে নির্বাহী পরচিালক আনোয়ার আজমি বলেন, বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে দেশ থেকে শিশু শ্রম কমানো সম্ভব হচ্ছে না। এখনো দেশের শিশুদের একটি বিশাল অংশ শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। দু:খজনক হলো এদের একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িত আছে। সরকার এবং এনজিওগুলো চেষ্টা করছে এ ব্যাপারে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে শিশু শ্রম নিরসনের বিষয়টি রয়েছে। সরকার এই অঙ্গীকারটি বাস্তবায়ন করলেই দেশ থেকে শিশু শ্রম নিরসন সফল হবে। ১২.০৬.২০১৫