ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৫:৪৯:১৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

অনলাইন হয়রানির বিপরীতে কতটা ভরসা ‘সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’?

নিজস্ব প্রতিবেদক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৫৮ এএম, ১৫ মে ২০২৬ শুক্রবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার নারীদের জন্য যেমন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। তেমনি বেড়েছে অনলাইন হয়রানি। ভুয়া আইডি, ব্ল্যাকমেইল, ছবি বিকৃতি এবং সাইবার বুলিংয়ের মতো অপরাধও। এমন বাস্তবতায় দেশের নারীদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশের উদ্যোগে চালু হয় ‘সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’।

প্রশ্ন হচ্ছে—এই সেল আসলে কী কাজ করে? কতটা কার্যকর? দেশের নারীরা আদৌ কি এর সুফল পাচ্ছেন?

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইনে সংঘটিত নানা ধরনের সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় এই সেল কিছুটা আশার জায়গা তৈরি করেছে। তবে সচেতনতার ঘাটতি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে।

কী এই সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন?

বাংলাদেশ পুলিশের পুলিশ সদর দপ্তরের অধীনে পরিচালিত এই বিশেষায়িত সেল মূলত নারীদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে।

ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো বা অন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীরা যদি হয়রানি, হুমকি, অশ্লীল বার্তা, ভুয়া আইডি, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হন, তাহলে তারা এই সেলে অভিযোগ জানাতে পারেন।

অভিযোগ পাওয়ার পর সেলটি প্রযুক্তিগত সহায়তা, আইনি পরামর্শ, সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট অপসারণের উদ্যোগ এবং প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে সহায়তা করে।

অভিযোগ করা যায় ফেসবুক পেজ, হটলাইন, ই-মেইল কিংবা সরাসরি অনলাইনে ফর্ম পূরণের মাধ্যমে।

কতটা কাজ করছে?

পুলিশ সদর দপ্তরের বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, চালুর পর থেকে হাজার হাজার নারী এই সেলের মাধ্যমে সহায়তা চেয়েছেন। অভিযোগের বড় অংশই ছিল—

ভুয়া ফেসবুক আইডি
ব্যক্তিগত ছবি/ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি
ব্ল্যাকমেইল
অনলাইন স্টকিং
অপমানজনক কনটেন্ট ছড়ানো

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্রুত কনটেন্ট সরানো বা অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়। কিছু ক্ষেত্রে অপরাধী শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের একজন অফিসার বলেন, অনেক নারী লজ্জা বা ভয় থেকে অভিযোগ করতে চান না। কিন্তু যারা অভিযোগ করেন, তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা প্রাথমিকভাবে সহায়তা দিতে পারি। ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে নারীদের আস্থা বাড়ছে।

উপকার পেয়েছেন যারা

রাজশাহীর বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী সাবিহা রহমান (ছদ্মনাম) জানান, এক ব্যক্তি তার ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে অশালীন পোস্ট করছিল।

আমি খুব ভেঙে পড়েছিলাম। পরিবারের কাউকে বলতেও ভয় পাচ্ছিলাম। পরে বন্ধুর পরামর্শে সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনে অভিযোগ করি। তিন দিনের মধ্যে আইডিটা বন্ধ হয়ে যায়- বলেন তিনি।

ঢাকার বেসরকারি চাকরিজীবী মেহজাবিন (ছদ্মনাম) জানান, পুরোনো পরিচিত এক ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত ছবি ফাঁসের হুমকি দিয়ে টাকা দাবি করছিল।

অভিযোগ করার পর পুলিশ আমাকে করণীয় বুঝিয়ে দেয়। পরে ওই ব্যক্তি আর যোগাযোগ করেনি- বলেন তিনি।

এমন অনেক ঘটনায় এই সেলের দ্রুত সাড়া ভুক্তভোগীদের মানসিক স্বস্তি দিয়েছে।

সীমাবদ্ধতাও আছে

তবে সব অভিযোগ যে দ্রুত সমাধান হয়, তা নয়। খুলনার এক স্কুলশিক্ষিকা অভিযোগ করেন, তার কেসে সাড়া পেতে প্রায় দুই সপ্তাহ লেগেছিল। ততদিনে অপমানজনক পোস্টটি অনেকের কাছে পৌঁছে যায়।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর আহমেদ বলেন,
উদ্যোগটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দ্রুত সমন্বয় বাড়ানো না গেলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন।

তার মতে, অনেক নারী এখনও জানেনই না যে এমন একটি সহায়তা সেল আছে। আবার গ্রামীণ অঞ্চলে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবে অভিযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

সামাজিক প্রভাব

অনলাইন হয়রানি শুধু ডিজিটাল সমস্যা নয়; এটি নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক অবস্থানে প্রভাব ফেলে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনলাইনে অপমান বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার নারীদের মধ্যে আতঙ্ক, অনিদ্রা, বিষণ্নতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

এই বাস্তবতায় সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন শুধু প্রযুক্তিগত সহায়তার জায়গা নয়, অনেকের জন্য এটি মানসিক নিরাপত্তারও একটি আশ্রয়।

তাহলে কি কাজ করছে?

সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বলা যায়, হ্যাঁ—সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন কাজ করছে এবং দেশের অনেক নারী এর মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন।

তবে এটিকে আরও কার্যকর করতে প্রয়োজন—

দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি
জেলা পর্যায়ে বিস্তৃতি
ব্যাপক প্রচার
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি
নারীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা

ডিজিটাল যুগে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পুলিশের একার দায়িত্ব নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগও জরুরি।

কারণ অনলাইন জগৎ নারীর জন্য নিরাপদ না হলে, আধুনিকতার বড় একটি প্রতিশ্রুতিই অপূর্ণ থেকে যাবে।