ইরানে কর্মক্ষেত্রে দৃশ্যমান হচ্ছে নারীর নতুন উত্থান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৬:৫৫ পিএম, ১৭ মে ২০২৬ রবিবার
ছবি: সংগ্রহিত।
ইরানের নগরজীবনে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে কর্মসংস্থানের চেনা ছবি। একসময় যেসব পেশা পুরুষদের জন্যই বেশি পরিচিত ছিল, সেসব জায়গায় এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। রাজধানী তেহরানের ব্যস্ত সড়ক থেকে শুরু করে আবাসন ব্যবসা, অনলাইন বিপণন, এমনকি মোটরসাইকেল কুরিয়ার সেবাতেও নারীরা নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবাখাতের সম্প্রসারণ—এই তিনটি বড় কারণ ইরানের কর্মবাজারে নারীদের উপস্থিতি বাড়িয়ে তুলছে।
তেহরানের নানা এলাকায় এখন মোটরসাইকেলে করে পার্সেল পৌঁছে দিতে দেখা যায় নারী কুরিয়ারদের। কয়েক বছর আগেও এমন দৃশ্য ছিল বিরল। এখনো অনেক গ্রাহক দরজা খুলে নারী ডেলিভারি কর্মী দেখে বিস্মিত হন, তবে ধীরে ধীরে এই চিত্র স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
এই পেশায় যুক্ত মারিয়াম নামের এক নারী জানান, সংসারের দায়িত্ব কাঁধে থাকায় আয়ের বিকল্প খুঁজতেই তিনি এ পেশায় আসেন। কাজের সময় নিজের মতো ঠিক করা যায়, ফলে সংসার ও কাজ—দুটিই সামলানো সহজ হয়।
তার ভাষায়, শুরুতে অনেকেই অবাক হয়ে তাকাতেন। কেউ কেউ পুরুষ ডেলিভারি কর্মী খুঁজতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।
আবাসন খাতেও নারীদের উপস্থিতি বাড়ছে উল্লেখযোগ্যভাবে। তেহরানের বিভিন্ন রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানে এখন নারী পরামর্শকদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, নারী গ্রাহক কিংবা পরিবার নিয়ে আসা ক্রেতারা অনেক সময় নারী পরামর্শকদের সঙ্গে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
দক্ষিণ তেহরানের একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী বলেন, বাড়ির পরিবেশ, নিরাপত্তা বা পারিবারিক সুবিধার মতো বিষয়গুলো নারীরা সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। এতে ক্রেতাদের সঙ্গে দ্রুত আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা, পণ্যের প্রচার, ভিডিও কনটেন্ট তৈরি কিংবা অনলাইন বিপণনে ইরানের তরুণীদের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ছে।
২৭ বছর বয়সী সারা জাওয়ানি জানান, ঘরে বসেই স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ থাকায় অনেক তরুণী এখন অনলাইনভিত্তিক পেশাকে বেছে নিচ্ছেন। প্রচলিত চাকরির তুলনায় এখানে আয়ও তুলনামূলক ভালো।
তবে তিনি বলেন, ইন্টারনেট বিভ্রাট, অস্থির আয় এবং তীব্র প্রতিযোগিতা এই খাতের বড় চ্যালেঞ্জ।
ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জীবনসংগ্রাম অনেক নারীকে নতুন পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য করছে। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ চালাতে ডেলিভারি সেবায় কাজ করছেন, কেউ বাস চালাচ্ছেন, কেউ আবার পরিবার চালাতে রাস্তায় সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নিচ্ছেন।
তেহরানের এক নারী বাসচালক জানান, পরিবারের পুরো দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার পর এই পেশায় আসেন তিনি। শুরুতে অনেকেই অবাক হলেও এখন যাত্রীরা তাকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের এই ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ শুধু অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথই খুলছে না, বরং ইরানের কর্মসংস্কৃতিতেও নতুন বৈচিত্র্য আনছে।
তবে এই পরিবর্তনকে স্থায়ী করতে প্রয়োজন নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত সুরক্ষা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নীতিগত সহায়তা। তা নিশ্চিত করা গেলে ইরানের কর্মবাজারে নারীদের এই অগ্রযাত্রা আরও শক্ত ভিত পাবে।
