মাটির অণুজীবের বিস্ময়, বৃষ্টি নামায় অদৃশ্য কারিগর
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১০:৫০ পিএম, ১৭ মে ২০২৬ রবিবার
ছবি: সংগ্রহিত।
বৃষ্টি নামার গল্পটা আমরা সাধারণত মেঘ, বাতাস আর জলীয় বাষ্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিচিত দৃশ্যের পেছনে কাজ করে আরও কিছু অদৃশ্য কারিগর—মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক। নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, এদের বিশেষ জৈব প্রক্রিয়াই অনেক সময় মেঘে বরফ কণা তৈরির সূচনা ঘটায়, যা শেষ পর্যন্ত বৃষ্টিতে রূপ নেয়।
আয়ারল্যান্ডের University of Limerick-এর গবেষকদের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাটিতে থাকা কিছু অণুজীব বায়ুমণ্ডলে উঠে গিয়ে মেঘের ভেতর বৃষ্টি তৈরির প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখে। গবেষকদের মতে, এটি প্রকৃতির এক বিস্ময়কর চক্র, যেখানে মাটি ও আকাশ পরস্পরের সঙ্গে অদৃশ্য বন্ধনে যুক্ত।
গবেষণায় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে ‘মরটিরিয়েলা’ ও ‘ফিউসারিয়াম’ প্রজাতির কিছু ছত্রাক। এসব ছত্রাক বিশেষ ধরনের প্রোটিন নিঃসরণ করে, যা বাতাসে ভেসে মেঘে পৌঁছায়। সেখানে এগুলো বরফ কণা তৈরির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে।
কীভাবে তৈরি হয় বৃষ্টি?
বায়ুমণ্ডলের অনেক উঁচুতে মেঘের ভেতরে থাকা পানি অনেক সময় শূন্য ডিগ্রিরও অনেক নিচে তরল অবস্থায় থাকে। একে বলা হয় ‘সুপারকুলড ওয়াটার’।
এই পানি বৃষ্টি বা তুষারে রূপ নিতে একটি সূচনাবিন্দু চায়—একটি ক্ষুদ্র কণা, যার চারপাশে জমাট বাঁধতে পারে বরফ।
সাধারণত ধুলিকণা বা লবণের ক্ষুদ্র অংশ এই কাজ করে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিছু অণুজীবের তৈরি প্রোটিন এই কাজে অনেক বেশি দক্ষ।
‘Pseudomonas syringae’ নামের ব্যাকটেরিয়ার কথা বিজ্ঞানীরা আগেই জানতেন। এটি খুব কম তাপমাত্রায় পানিকে দ্রুত বরফে পরিণত করতে পারে।
এখন দেখা যাচ্ছে, কিছু ছত্রাক এ ক্ষেত্রে আরও বেশি কার্যকর।
ছত্রাকের গোপন শক্তি
ব্যাকটেরিয়া সাধারণত নিজেদের শরীরের গায়ে বরফ তৈরির উপাদান ধরে রাখে। কিন্তু ছত্রাক এগুলো চারপাশে ছড়িয়ে দেয়।
এই ক্ষুদ্র প্রোটিন বাতাসে সহজে ভেসে উঠে মেঘের স্তরে পৌঁছে যায় এবং তুলনামূলক উষ্ণ তাপমাত্রাতেও বরফ কণা তৈরি করতে সক্ষম হয়।
ফলে বৃষ্টি তৈরির সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
গবেষকদের মতে, প্রকৃতির এই প্রক্রিয়া অনেকটা স্বয়ংক্রিয় বৃষ্টিবীজ ছড়ানোর মতো।
বিবর্তনের এক আশ্চর্য গল্প
আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো—এই ক্ষমতা ছত্রাকরা নিজে তৈরি করেনি।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বহু কোটি বছর আগে ব্যাকটেরিয়ার কাছ থেকে জিনগত বৈশিষ্ট্য ধার করে তারা এই ক্ষমতা অর্জন করেছে।
বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় হরাইজন্টাল জিন ট্রান্সফার—অর্থাৎ এক জীব থেকে অন্য জীবে সরাসরি জিনগত তথ্য স্থানান্তর।
এই বৈশিষ্ট্য ছত্রাককে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?
এই গবেষণা শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের বিষয় নয়; এর রয়েছে বাস্তব প্রয়োগও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব কৃত্রিম বৃষ্টিপাত প্রযুক্তি তৈরিতে এই প্রাকৃতিক প্রোটিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
বর্তমানে অনেক দেশে কৃত্রিম বৃষ্টির জন্য সিলভার আয়োডাইডের মতো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কিন্তু অণুজীবভিত্তিক পদ্ধতি তুলনামূলক নিরাপদ ও টেকসই হতে পারে।
বন উজাড়ের সঙ্গে সম্পর্ক
এই আবিষ্কার বন ও মাটির জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্বও নতুন করে সামনে এনেছে।
কারণ বন ধ্বংস হলে শুধু গাছপালাই হারায় না, হারিয়ে যায় সেই অণুজীবের আবাসস্থলও, যারা আঞ্চলিক বৃষ্টিপাতের প্রাকৃতিক চক্রে ভূমিকা রাখে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে মাটির নিচের এই ক্ষুদ্র প্রাণীদের গুরুত্ব নতুন করে বোঝা জরুরি।
হয়তো আগামী দিনের বৃষ্টির রহস্য লুকিয়ে আছে আমাদের পায়ের নিচের অদৃশ্য সেই জগতে।
