দুনিয়া নাড়িয়ে দেওয়া সাংবাদিক নেলি ব্লি-র গল্প
আইরীন নিয়াজী মান্না
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০১:১৯ পিএম, ১৮ মে ২০২৬ সোমবার
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রবক্তা নেলি ব্লি।
সে এক বিস্ময়কর গল্প! উনিশ শতকের শেষভাগ—সংবাদপত্র তখনও মূলত পুরুষদের দখলে। ঠিক সেই সময়ই প্রচলিত নিয়ম ভেঙে এক নারী সাংবাদিক নিজের কলম আর সাহস দিয়ে বদলে দেন সাংবাদিকতার ধারা। তিনি নেলি ব্লি (Nellie Bly)—যার প্রকৃত নাম এলিজাবেথ কোচরান সিম্যান। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হিসেবে আজও তার নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে।
শুরুর গল্প: প্রতিবাদ থেকেই পথচলা: ১৮৬৪ সালের ৫ মে, যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায় জন্ম নেন নেলি ব্লি। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সাহসী ও স্পষ্টভাষী। তার সাংবাদিকতায় আসার গল্পটাও অনন্য। একবার একটি পত্রিকায় নারীদের নিয়ে অবমাননাকর লেখা দেখে প্রতিবাদমূলক চিঠি লেখেন তিনি। সেই চিঠির ভাষা ও যুক্তিতে মুগ্ধ হয়ে তাকে লেখার প্রস্তাব দেয় পত্রিকাটি। সেখান থেকেই শুরু।
তিনি কাজ শুরু করেন পিটসবার্গ ডিসপ্যাচ-এ। প্রথমদিকে নারীজীবন, শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে লিখতেন। কিন্তু সীমাবদ্ধতায় বিরক্ত হয়ে বড় কিছু করার স্বপ্নে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে।
উন্মাদ আশ্রমে ‘পাগল’ সেজে: নেলি ব্লি’র সবচেয়ে আলোচিত কাজগুলোর একটি—নিজেকে মানসিক রোগী সাজিয়ে একটি আশ্রমে প্রবেশ করা। নিউইয়র্কের নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড-এর হয়ে তিনি এই দুঃসাহসিক প্রতিবেদনটি করেন।
তিনি ১০ দিন কাটানব্ল্যাকওয়েলস আইল্যান্ড ইনসেইন অ্যাসাইলাম (মানসিক রোগীদের আশ্রয়কেন্দ্র)-এ (বর্তমান রুজভেল্ট আইল্যান্ড)। সেখানে রোগীদের ওপর নির্যাতন, অবহেলা ও অমানবিক পরিবেশ নিজের চোখে দেখেন। বেরিয়ে এসে লেখেন ধারাবাহিক প্রতিবেদন, যা পরে বই আকারে প্রকাশিত হয়— টেন ডেজ ইন আ ম্যাড-হাউস।
এই প্রতিবেদনের পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় সংস্কার আনা হয়, বাজেট বাড়ানো হয়। একজন সাংবাদিক যে সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে—তা প্রমাণ করেন নেলি ব্লি।
বিশ্বভ্রমণ: ৭২ দিনে পৃথিবী ঘোরা: নেলি ব্লি শুধু অনুসন্ধানী সাংবাদিকই নন, ছিলেন এক দুঃসাহসী অভিযাত্রীও। ফরাসি লেখক জুল ভার্ন-এর উপন্যাস অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ-এর নায়ক ফিলিয়াস ফগের রেকর্ড ভাঙার চ্যালেঞ্জ নেন তিনি।
১৮৮৯ সালে শুরু করেন বিশ্বভ্রমণ, শেষ করেন মাত্র ৭২ দিনে! সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন সেভেনটি-টু ডেজ। এটি তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়।
সমাজের অন্য প্রান্তে ঢুকে পড়া: নেলি ব্লি-র সাংবাদিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—নিজেকে ঘটনার ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া। তিনি কখনো কারখানার শ্রমিক, কখনো গৃহকর্মী, কখনো দরিদ্র নারী সেজে বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তার রিপোর্টগুলো ছিল জীবন্ত, তীক্ষ্ণ এবং সমাজের অন্ধকার দিক উন্মোচনকারী।
ব্যবসায়ী হিসেবেও সফল: পরবর্তী সময়ে নেলি ব্লি বিয়ে করেন শিল্পপতি রবার্ট সিম্যানকে। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি তার কোম্পানি আয়রন ক্ল্যাড ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি পরিচালনা করেন। সে সময় একজন নারী হিসেবে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালানো ছিল বিরল ঘটনা।
শেষ জীবন ও উত্তরাধিকার: ১৯২২ সালে ১৯২২ সালের ২৭ জানুয়ারি নিউইয়র্কে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু তার রেখে যাওয়া পথ এখনও জীবন্ত। আজকের আন্ডারকভার রিপোর্টিং, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা— সবকিছুর শেকড়েই রয়েছে নেলি ব্লি-র সাহসী পদচিহ্ন।
কেন আজও প্রাসঙ্গিক: নেলি ব্লি দেখিয়েছেন—সাংবাদিকতা শুধু খবর লেখা নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মাধ্যম। তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যের খোঁজে ঝুঁকি নিতে হয়, আর সেই সাহসই বদলে দিতে পারে সমাজ। সাহসী ও প্রভাবশালী সাংবাদিক হিসেবে তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
