আয়নায় মুখ: পার্লারকন্যাদের জীবনের সাতকাহন
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৪:০০ পিএম, ১৮ মে ২০২৬ সোমবার
ছবি: সংগ্রহিত।
সকাল হলেই রাজধানীর অলিগলিতে একের পর এক পার্লারের শাটার ওঠে। আয়নার সামনে বসে থাকা মেয়েগুলো তখন সাজাতে শুরু করে অন্যদের মুখ—আর আড়ালে লুকিয়ে থাকে নিজেদের ক্লান্তি, সংগ্রাম আর স্বপ্ন। রাজধানীর অসংখ্য বিউটি পার্লারে কাজ করা এসব তরুণী শুধু রূপচর্চার কারিগর নন, তারা পরিবারের ভরসা, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যোদ্ধা।
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা ও ধানমন্ডি এলাকার বিভিন্ন পার্লারে কথা হয় কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে। তাদের বেশিরভাগই এসেছেন গ্রাম থেকে—দারিদ্র্য, সংসারের চাপ কিংবা পড়াশোনার খরচ জোগাতে কাজ বেছে নিয়েছেন পার্লারে।
মিরপুরের একটি পার্লারে কাজ করা ২২ বছর বয়সী রুনা আক্তার (ছদ্মনাম) বলেন, বাবা অসুস্থ। আমি না কাজ করলে ঘরে চাল আসবে না। প্রথমে ভয় লাগত, এখন আয়নাটার সামনে দাঁড়ালেই মনে হয়—আমি পারছি।
তিনি জানান, মাসে গড়ে ১২–১৫ হাজার টাকা আয় করেন। সেই টাকা থেকেই চলে সংসার ও নিজের পড়াশোনার খরচ।
প্রশিক্ষণ থেকে পেশা:
অনেক মেয়েই আগে বিউটি পার্লার ট্রেনিং সেন্টারে কোর্স করেন। তারপর শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজে ঢোকেন।
ধানমন্ডির একটি পার্লারের কর্মী সুমি বেগম বলেন, তিন মাস ট্রেনিং করেছি। শুরুতে বেতন কম ছিল, এখন গ্রাহকরা আমাকে চিনে। ভালো কাজ করলে টিপসও পাই।
তার ভাষায়, পার্লার তার কাছে শুধু চাকরি নয়—একটা পরিচয়।
সম্মান ও নিরাপত্তার প্রশ্ন: তবে এই পেশায় কাজ করতে গিয়ে নানা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির মুখোমুখি হতে হয় তাদের।
উত্তরার একটি পার্লারের কর্মী নাসরিন বলেন, অনেকে ভাবেন পর্লারে কাজ মানে সম্মান কম। কিন্তু আমরা তো পরিশ্রম করে রোজগার করি। এতে লজ্জার কী আছে?
কখনো কখনো হয়রানির মুখেও পড়তে হয় বলে জানান কয়েকজন। বিশেষ করে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হলে নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে।
স্বপ্নের গল্প: এই মেয়েদের অনেকেরই স্বপ্ন বড়। কেউ নিজে পর্লার খুলতে চান, কেউ পড়াশোনা শেষ করে অন্য পেশায় যেতে চান।
মোহাম্মদপুরের একটি পার্লারে কাজ করা শিলা আক্তার বলেন,
আমি নিজে একটা ছোট পার্লার দিতে চাই। যেন অন্য মেয়েরাও কাজ পায়। আমি জানি, কষ্ট কী জিনিস।
আরেক কর্মী জান্নাতি বলেন, আমার স্বপ্ন নার্স হওয়া। এই কাজটা করছি শুধু পড়ার খরচ চালানোর জন্য।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পেশা অনেক নারীর জন্য অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দরজা খুলে দিয়েছে। কম শিক্ষিত বা মাঝপথে পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হওয়া মেয়েরাও এখানে দক্ষতা দিয়ে আয় করতে পারছেন।
নারী অধিকারকর্মী ইফফাত আরা বলেন, পার্লারকর্মীরা অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের অংশ। তাদের শ্রমকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং কাজের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
আয়নার ওপাশে জীবন: পার্লারের আয়নায় গ্রাহকের মুখে যখন হাসি ফুটে ওঠে, তখন সেই হাসির পেছনে থাকে একেকজন মেয়ের জীবনের গল্প—সংসারের দায়, স্বপ্নের লড়াই, আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস।
তাই তো এই মেয়েরা বলেন, আমরা শুধু অন্যকে সাজাই না, নিজের জীবনও সাজাই।
