দেশে তালাক বাড়ছে, মেয়েরা বেশি দিচ্ছে
জোসেফ সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১১:৩৭ এএম, ২০ মে ২০২৬ বুধবার
প্রতীকী ছবি।
গত কয়েক বছরে দেশে তালাকের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো—এই তালাকের বড় অংশের উদ্যোগ নিচ্ছেন নারীরাই। সমাজে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে তালাককে ‘পুরুষের সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখা হতো, সেখানে এখন চিত্র বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে সম্পর্কের ধরন, প্রত্যাশা আর নারীদের অবস্থান।
পরিসংখ্যান কী বলছে: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে তালাকের আবেদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অনেক এলাকায় প্রতি বছর তালাকের নোটিশ বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। সবচেয়ে বেশি তালাকের আবেদন এসেছে শহরাঞ্চল থেকে। এর মধ্যে নারীদের পক্ষ থেকে দেওয়া আবেদন সংখ্যায় পুরুষদের চেয়ে বেশি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা আব্দুল রাজ্জাক জানান, আগে তালাকের নোটিশে পুরুষের নামই বেশি থাকত। এখন নারীর নামই বেশি আসছে।
কেন বাড়ছে তালাক: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তালাক বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে—
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা
নারীরা এখন আগের চেয়ে বেশি চাকরি করছেন, আয় করছেন। ফলে সহিংসতা বা অবহেলার মধ্যেও সংসারে টিকে থাকার বাধ্যবাধকতা কমছে।
পারিবারিক সহিংসতা ও মানসিক নির্যাতন
নারী সংগঠনগুলোর তথ্যে দেখা যায়, অনেক তালাকের পেছনে রয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, মাদকাসক্ত স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির চাপ।
প্রত্যাশার দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব
বিশেষ করে শহুরে দম্পতিদের মধ্যে জীবনধারা ও মূল্যবোধের পার্থক্য বড় কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানী আসমা সাদেক বলেন, বিয়ে এখন শুধু সামাজিক প্রতিষ্ঠান নয়, আবেগ ও সমানাধিকারের সম্পর্ক। সেই জায়গায় সমঝোতা না হলে বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়।
ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: ইসলামি শরিয়তে তালাকের বিধান থাকলেও সামাজিকভাবে তালাককে এখনও নেতিবাচক চোখে দেখা হয়, বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গিও ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।
সিনিয় আইনজীবী দিলশাদ নিয়াজী মান্না বলেন, নারীরা এখন আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন। তারা জানে, তালাক মানেই শেষ নয়; নতুন জীবনও শুরু করা যায়।
সন্তানদের ওপর প্রভাব: তালাকের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে সন্তানরা। ভাঙা সংসারে বড় হওয়া শিশুদের মানসিক চাপ বাড়ে, পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যেতে পারে।
হেমা দাশ নামে একজন স্কুলশিক্ষক বলেন, অনেক শিক্ষার্থী মানসিক অস্থিরতায় ভোগে। মা-বাবার বিচ্ছেদ তাদের আত্মবিশ্বাসে আঘাত করে।
শহর ও গ্রামের পার্থক্য: গ্রামাঞ্চলে তালাকের হার তুলনামূলক কম হলেও সেখানে নারীর ওপর সামাজিক চাপ বেশি। অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হলেও তালাকের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।
বিশেষজ্ঞদের মত: নারী অধিকারকর্মী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, তালাক বৃদ্ধি শুধু সম্পর্ক ভাঙার গল্প নয়, এটি সমাজের রূপান্তরেরও ইঙ্গিত।
নারী অধিকারকর্মীর আফরোজা সুলতানা বলেন, এটা নারীর সচেতনতার প্রতিফলন। অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার প্রবণতা বাড়ছে।
মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল বলেন, দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও যোগাযোগ সবচেয়ে জরুরি। নচেৎ বিচ্ছেদ অনিবার্য।
উপসংহার: দেশে তালাকের হার বৃদ্ধি একটি সামাজিক বাস্তবতা। বিশেষ করে নারীদের উদ্যোগে তালাক বাড়া প্রমাণ করে—নারীরা এখন অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে চাইছে না। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন পারিবারিক পরামর্শ, দাম্পত্য কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থার বিস্তার।
কারণ তালাক শুধু দুজন মানুষের বিচ্ছেদ নয়, এটি একটি পরিবারের ভাঙন—যার প্রভাব পড়ে সন্তান, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর।
