ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৫:৫১:০২ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

শিশুর কান্না ও আমাদের নীরবতা! জাস্টিস ফর রামিসা

দীপালি হাসান

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:০৭ পিএম, ২২ মে ২০২৬ শুক্রবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

একটি দেশের সভ্যতা বোঝা যায় সে দেশ তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে, তা দিয়ে। যে সমাজে শিশুরা ভয় নিয়ে বড় হয়, যে সমাজে মায়ের বুক কেঁপে ওঠে সন্তান স্কুলে গেলে, সেই সমাজের উন্নয়ন যত উঁচুতেই উঠুক—ভেতরে ভেতরে সেখানে বড় এক অন্ধকার রয়ে যায়।

রামিসা সেই অন্ধকারেরই আরেকটি নাম।

সাত বছরের একটি শিশু। বয়সটা এমন, যখন পৃথিবীকে এখনও রঙিন মনে হয়। যখন আকাশ মানেই নীল, বৃষ্টি মানেই আনন্দ, আর মানুষ মানেই নিরাপত্তা। সেই ছোট্ট শিশুটিকেই এমন নির্মম পরিণতির শিকার হতে হলো, যা কল্পনা করতেও শিউরে উঠতে হয়।

এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়। এটি আমাদের সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। কারণ একটি শিশু কখনো একদিনে অনিরাপদ হয়ে ওঠে না। তার চারপাশের সমাজ ধীরে ধীরে তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।

আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মানুষ ক্রমেই অসংবেদনশীল হয়ে পড়ছে। সম্পর্কের উষ্ণতা কমছে, মানবিকতা শুকিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ঝড়ে, মানুষ বিচার চায়, ফাঁসির দাবি তোলে—কিন্তু কিছুদিন পরই সব থেমে যায়। নতুন কোনো ঘটনা এসে পুরোনো কান্নাকে ঢেকে দেয়।

কিন্তু যে পরিবার সন্তান হারায়, তাদের কাছে সময় থেমে থাকে।

রামিসার মা হয়তো এখনো রাতের বেলা ঘুম ভেঙে মেয়ের নাম ধরে ডাকেন। হয়তো ছোট্ট জামাটা বুকের কাছে চেপে ধরে কাঁদেন। হয়তো মনে পড়ে—সেদিন সকালে শিশুটি কী খেতে চেয়েছিল, কী কথা বলেছিল। এসব স্মৃতি মানুষকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে দেয়।

শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ার পেছনে শুধু আইনের দুর্বলতা নয়, সামাজিক অবক্ষয়ও বড় কারণ। পরিবারে সহিংসতা, মাদক, বিকৃত মানসিকতা, অনলাইন অপসংস্কৃতি, নারীর প্রতি অসম্মান—সব মিলেই তৈরি হচ্ছে এক ভয়ংকর বাস্তবতা।

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, অপরাধীরা অনেক সময় জানে—বিচার দীর্ঘ হবে, সাক্ষী দুর্বল হবে, মানুষ ভুলে যাবে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই তাদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা নয়; দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন শিশু সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রতিটি স্কুল, মহল্লা, গণপরিবহন, এমনকি অনলাইন জগতও শিশুদের জন্য নিরাপদ করতে হবে।

তবে আইন একা সব করতে পারবে না। সমাজকে বদলাতে হবে। পরিবারকে সন্তানদের কথা শুনতে হবে, শিশুদের ভয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের ছেলেশিশুদেরও শেখাতে হবে—নারী ও শিশুর প্রতি সম্মান কাকে বলে।

একটি শিশু যখন মারা যায়, তখন শুধু একটি প্রাণ ঝরে যায় না—একটি সম্ভাবনা হারিয়ে যায়। হয়তো রামিসা বড় হয়ে শিক্ষক হতো, চিকিৎসক হতো, কবি হতো। হয়তো বৃদ্ধ মা-বাবার ভরসা হতো। সেই সম্ভাবনাকেই আমরা রক্ষা করতে পারিনি।

প্রশ্ন হলো—আর কত রামিসা হারালে আমরা সত্যিই বদলাব?