ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৫:৫১:৩২ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

দুখু মিয়া থেকে বিদ্রোহী কবি: নজরুলের বিস্ময়কর জীবন

আইরীন নিয়াজী মান্না

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৩৭ এএম, ২৫ মে ২০২৬ সোমবার

ফাইল ছবি।

ফাইল ছবি।

বাংলা সাহিত্যের আকাশে কাজী নজরুল ইসলাম এক উজ্জ্বল ধূমকেতুর নাম। তাঁর কবিতা যেমন বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়েছে, তেমনি তাঁর ব্যক্তিজীবনও ছিল রঙিন, বৈচিত্র্যময় আর ঘটনাবহুল। দারিদ্র্য, প্রেম, দুষ্টুমি, গান, রাজনীতি—সব মিলিয়ে নজরুলের জীবন যেন নিজেই এক উপন্যাস। জাতীয় কবির জীবনের এমন কিছু মজার ও চমকপ্রদ ঘটনা আজও মানুষকে বিস্মিত করে।

‘দুখু মিয়া’ নামের পেছনের গল্প

নজরুলের ডাকনাম ছিল “দুখু মিয়া”। নামটি শুনতে মজার লাগলেও এর পেছনে ছিল জীবনের কঠিন বাস্তবতা। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে সংসারের অভাব-অনটনের মধ্যে বড় হতে হয়েছিল তাঁকে। পরিবারের মানুষজন মনে করতেন, ছেলেটার জীবন বুঝি শুধু দুঃখেই ভরা—সেখান থেকেই “দুখু মিয়া” নাম।

কিন্তু মজার বিষয় হলো, এই দুখু মিয়াই পরে হয়ে উঠলেন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও দুরন্ত কবিদের একজন।

রুটির দোকানে কাজ করতেন নজরুল

কৈশোরে জীবিকার তাগিদে এক রুটির দোকানে কাজ করেছিলেন তিনি। দোকানে রুটি বানানো, খাবার পরিবেশন—সবই করতেন। সেই দোকানের শ্রমিক ছেলেটি যে একদিন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বদলে দেবেন, তখন কেউ ভাবেনি।

অনেকে বলেন, মানুষের কষ্টকে এত গভীরভাবে বুঝতে পারার পেছনে তাঁর এই শ্রমজীবনের অভিজ্ঞতা বড় ভূমিকা রেখেছিল।

লেটো দলে গান লিখে তাক লাগানো

ছোটবেলায় নজরুল যোগ দেন গ্রামবাংলার “লেটো” দলে। সেখানে তিনি গান লিখতেন, অভিনয় করতেন, এমনকি মেয়েদের চরিত্রেও অভিনয় করেছেন। খুব অল্প বয়সেই তাঁর ছন্দ ও সুর তৈরির অসাধারণ ক্ষমতা দেখে সবাই অবাক হয়ে যেত। এই লেটো দলের অভিজ্ঞতাই পরে তাঁর গান ও কবিতায় নাটকীয়তা এনে দেয়।

সৈনিক নজরুল

অনেকেই জানেন না, নজরুল ছিলেন একজন সৈনিকও। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। করাচিতে অবস্থানকালে তিনি ফারসি সাহিত্য, ইসলামী ইতিহাস ও বিশ্বসাহিত্য পড়ার সুযোগ পান।

সেনাবাহিনীর কঠোর জীবনের মধ্যেও তিনি কবিতা লিখতেন। বলা হয়, সহযোদ্ধাদের গান শোনাতে শোনাতেই তাঁর ভেতরের শিল্পী আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

‘বিদ্রোহী’ লিখে রাতারাতি বিখ্যাত

১৯২২ সালে প্রকাশিত “বিদ্রোহী” কবিতা নজরুলকে রাতারাতি আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। কবিতাটি পড়ে অনেকে এতটাই বিস্মিত হয়েছিলেন যে, বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না এত তরুণ একজন কবি এমন আগুনঝরা কবিতা লিখতে পারেন।

সেই সময় সাহিত্যাঙ্গনে যেন হঠাৎ ঝড় বয়ে গিয়েছিল।

জেলে বসেও থামেননি

ব্রিটিশবিরোধী লেখার কারণে নজরুলকে কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু জেলও তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং কারাগারে বসেই তিনি লিখেছিলেন অসংখ্য কবিতা ও গান।

একবার জেলের খাবারের মানের প্রতিবাদে তিনি টানা অনশন শুরু করেন। তাঁর অনশন ভাঙাতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বার্তা পাঠিয়েছিলেন।

প্রেমেও ছিলেন দুরন্ত

নজরুলের প্রেমজীবনও ছিল বেশ আলোচিত। তিনি প্রেমে পড়েছিলেন একাধিকবার। তাঁর স্ত্রী প্রমীলা দেবী ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। সে সময় ধর্মীয় ভিন্নতার এই বিয়ে সমাজে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

কিন্তু নজরুল সবসময়ই ভালোবাসাকে ধর্মের ঊর্ধ্বে দেখেছেন।

খাবার আর আড্ডা খুব পছন্দ করতেন

বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে খুব ভালোবাসতেন নজরুল। গান, গল্প আর হাসিতে জমিয়ে রাখতেন পুরো পরিবেশ। তিনি খেতে ভালোবাসতেন, বিশেষ করে মিষ্টি ও নানা রকম খাবার।

তাঁর আশপাশে সবসময় যেন এক প্রাণচাঞ্চল্য থাকত।

শিশুদেরও ছিলেন প্রিয় কবি

যদিও তাঁকে “বিদ্রোহী কবি” বলা হয়, ছোটদের জন্যও তিনি অসাধারণ সব লেখা লিখেছেন। “লিচু চোর”, “খুকি ও কাঠবিড়ালি”, “ঝিঙেফুল”—এসব ছড়া আজও শিশুদের মুখে মুখে ফেরে।

দুষ্টুমি আর হাস্যরসে ভরা এসব লেখায় দেখা যায় নজরুলের আরেকটি কোমল ও আনন্দময় রূপ।

শেষ জীবন: নীরব এক কবি

জীবনের শেষ দিকে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি বাকশক্তি হারান। একসময় যিনি বজ্রকণ্ঠে বিদ্রোহের গান শুনিয়েছেন, সেই কবিই ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যান।

তবু তাঁর সৃষ্টি কখনো নীরব হয়নি। আজও তাঁর কবিতা, গান আর চেতনা মানুষকে সাহস দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়।

দুখু মিয়া থেকে বিদ্রোহী কবি হয়ে ওঠা নজরুলের জীবন আসলে এক আশ্চর্য যাত্রা—যেখানে দারিদ্র্য আছে, প্রেম আছে, বিদ্রোহ আছে, আবার আছে অপার মানবতা ও আনন্দের দীপ্তি।