আবু হাসান শাহরিয়ারের শিশুসাহিত্য ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
হাসনারত আমজাদ
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০১:৩৩ পিএম, ১ জুন ২০২৬ সোমবার
ছবি: সংগ্রহিত।
বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। এই কবি তার মেধাবী সৃষ্টিকর্মের জন্য এপার বাংলার পাশাপাশি ওপার বাংলাতেও ব্যাপকভাবে আলোচিত, সমাদৃত এবং স্বীকৃত। আবার প্রচণ্ড- জেদী, স্পষ্টবাদী, একগুঁয়ে এবং অহংকারী স্বভাবের কারণে কারো কারো কাছে তিনি অপ্রিয়ও বটে। তার কথায় নেই কোনো রাখঢাক। কিন্তু তাঁর মস্তিষ্ক যেন এক চলমান কম্পিউটার। কী কবিতা, কী গল্প, কী প্রবন্ধ, কী ছড়া সবটাতেই তার সমান নৈপুণ্য, সমান দখল। কিন্তু বর্তমান সময়ের অনেক নতুন লেখক জানেনই না যে, বড়দের সাহিত্যের পাশাপাশি আবু হাসান শাহরিয়ার শিশুসাহিত্যের জন্যও কি চমক রেখে গেছেন। তারা জানেন না যে, শিশুসাহিত্য দিয়েই তার লেখার হাতেখড়ি হয়েছে। যৌবনের শুরুর উদ্দাম দিনগুলিতে শিশুসাহিত্যের জন্য কী পরিমাণ শ্রম দিয়েছেন আবু হাসান শাহরিয়ার। শিশুকিশোরদের জন্য কত উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি রয়েছে আবু হাসান শাহরিয়ারের। যদিও তার অসংখ্য প্রকাশনার মধ্যে মাত্র তিনটি বই যথাক্রমে পায়ে নুপুর, ভরদুপুরে অনেক দূরে এবং আয়রে আমার ছেলেবেলা শিশুকিশোর উপযোগী। কিন্তু এই তিনটি বই-ই সাড়া জাগানোর মতো। এই তিনটি বইয়ের জন্যই বাংলাভাষার শিশুসাহিত্য যুগ যুগ ধরে মনে রাখবে শিশুসাহিত্যিক আবু হাসান শাহরিয়ারকে। আবু হাসান শাহরিয়ারের কবিতা নিয়ে, বড়দের সাহিত্য নিয়ে অনেক গুণীজন, অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি অনেক কিছু বলেছেন, অনেক কিছু লিখে গেছেন। কবিতার জন্য তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পদক। কিন্তু সেসব নিয়ে আলোচনা না করে শুধুমাত্র আবু হাসান শাহরিয়ারের শিশুসাহিত্য নিয়ে কিছু কথা বলবো।
ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও লেখক ভাবনা
ব্যক্তিজীবনে স্পষ্টবাদী, দৃঢ়চেতা ও আপসহীন আবু হাসান শাহরিয়ার। তিনি বলেন, ‘লাগে না পদক-খ্যাতি যদি থাকে লেখার শ্রাবণ’। ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন, কবি-লেখকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার পাঠক। তার উল্লেখযোগ্য একটি বাক্য প্রায় তিনি উচ্চারণ করেন, ‘স্লেটে লেখা নাম আমি মুছে যেতে আসি।’ সবাই মুছে যেতেই আসে। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে জীবনের সব আনন্দ মুছে যায়। একজীবনের লেখালেখির আনন্দও। তখন কে কী বললো, তাতে কিছু যায় আসে না। অমরতা বলে কিছু নেই। তিনি বলেন, শুধু বয়সের উচ্চতায় আমি কাউকে মান্যতা দিই না, গুণ থাকলে কম বয়সীদেরও শ্রদ্ধা করি।
একুশের গ্রন্থমেলায় প্রতি বছর শত শত বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। আবু হাসান শাহরিয়ার এই প্রচলিত ধারার বিপক্ষে বরাবরই। তার বক্তব্য, নতুন বই প্রকাশের পর তার পাঠ উন্মোচন হবে, মোড়ক উন্মোচন নয়। পাঠ করে শোনাতে হবে বইয়ের উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ, কিছু কবিতা, কিছু ছড়া যার মাধ্যমেই উদ্বোধন হবে বইয়ের। নতুন একটি বই পাঠ উন্মোচনের মধ্য দিয়েই ভূমিষ্ঠ হবে পৃথিবীতে। আবু হাসান শাহরিয়ারের একটি কিশোরকবিতার মাধ্যমে শিশুসাহিত্যিক আবু হাসান শাহরিয়ারের পরিচয় প্রথমেই করাতে চাচ্ছি।
রাত যমুনার ইস্টিমারে-
দূরের ঘাট জোনাক বাতি ইষ্টিমারে সিটি
মাঝ-যমুনায় রাতের কালো ঢেউ
কাছের চড়ায় রাত-পাহারায় একটানা ঘেউ ঘেউ।
কুকুর টহল দিচ্ছে চড়ায়
আকাশ পাহারায়
লক্ষ তারার টর্চ জ¦ালিয়ে
কে যায় কারা যায়?
চুলের পালে বাতাস নাচে
হঠাৎ মনে দোলা
ইচ্ছে-মাঝির নৌকা আমি
দুরন্ত পালতোলা।
দূরের ঘাটে জোনাক বাতি
মাঝ যমুনায় আমি
রূপকথার এক রাজার কুমার অথই জলে নামি।
কী অদ্ভুত মায়াময়তা এই ছোট্ট লেখাটিতে। সিরাজগঞ্জের কড্ডাকৃষ্ণপুর আর দুরন্ত যমুনা একসারিতে বাঁধা। কড্ডাকৃষ্ণপুর যেতে হলে একসময় ফেরিতে পাড়ি দিতে হতো রাতের যমুনা। আরিচা হয়ে নগরবাড়ি ফেরি। ধারণা করি, সেই রাতের যমুনা পাড়ি দিতে গিয়ে কোনো ্একদিন ইচ্ছে-মাঝির নৌকা হয়ে কবিতার পাল তুলেছিলেন ছড়াকবি আবু হাসান শাহরিয়ার। চমৎকার এই কিশোরকবিতাটির জন্ম দিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ না করলেই নয়, যারা ছড়া লেখেন, কিশোরকবিতা লেখেন, আবু হাসান শাহরিয়ার তাদেরকে কবি বা ছড়াকার না বলে বলেন ছড়াকবি। তাইতো তিনি নিজেও একজন ছড়াকবি।
জন্ম ও লেখালেখির শুরু
আবু হাসান শাহরিয়ারের জন্ম ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে জুন রাজশাহীতে। পৈতৃক নিবাস কড্ডাকৃষ্ণপুর, সিরাজগঞ্জ। তার বাবা শিক্ষাবিদ মুহাম্মদ সিরাজউদ্দীন ছিলেন একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও সরকারি কলেজের অধ্যাপক। তিনি পিতা এবং মাতা লেখিকা রাবেযা সিরাজ-এর একমাত্র পুত্র, পরিণযসূত্রে কথাসাহিত্যিক মনিরা কায়েস তার জীবন সঙ্গিনী। মনিরা কায়েস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। একমাত্র সন্তান অথৈ নীলিমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এখন দেশের বাইরে অবস্থান করছে। আবু হাসান শাহরিয়ারের শৈশব কেটেছে ময়মনসিংহ, কুমিল্লা এবং ঢাকা শহরে। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে এসএসসি এবং ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি উত্তীর্ণ হওয়ার পর চিকিৎসক হবার ইচ্ছা নিয়ে তিনি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্র তাকে বেশিদিন আকর্ষণ করে রাখতে পারেনি। তিনি এক বছর পডার পর মেডিক্যাল কলেজ চিরতরে পরিত্যাগ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হন এবং সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। কিছুদিনের মধ্যে তিনি প্রকাশনা ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। এরপর প্রবেশ করেন সাংবাদিকতায়।
বাইরে তপ্ত কঠিন একটা রূপ থাকলেও আবু হাসান শাহরিয়ারের ভেতরে বাস করে এক আবেগি শিশুমন, যা একজন শিশুসাহিত্যিকের। যা তার সাথে গভীরভাবে না মিশলে বোঝা যায় না। শাহরিয়ারের বাইরের দিক অনেকটা শক্ত বরফের মতো, খুব কাছে গেলে সেই বরফ আস্তে আস্তে গলতে শুরু করে। একসময় তা গলে ঠান্ডা পানি হয়ে যায়। শাহরিয়ারকে খুব কাছ থেকে যারা দেখেছেন তারা তার এই রূপটাকে বুঝতে পারেন। আর এই শিশুমন আছে বলেই তিনি রচনা করতে পেরেছেন অসম্ভব ভালোলাগা কিছু ছড়া, আচ্ছন্ন করা কিছু কিশোরকবিতা। বেশ কয়েক বছর আগে ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে তৃতীয় শিশুসাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ও সংগঠক রাশেদ রউফের বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমি এ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলো। কবি আবু হাসান শাহরিয়ার বলেন, লেখকের মধ্যে যদি শিশুমনটি না থাকে তবে তাঁর পক্ষে কবি হওয়া সম্ভব নয়। শিশুদের নিয়ে কাজ করতে হলে তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়-আশয় বুঝতে হবে। আর তাইতো তিনি বারবার ফিরে যেতে যান ছেলেবেলায়। ছেলেবেলার সেই শিশু তাকে বারবার ডাকে আর ছেলেবেলাকে তিনি ডাকেন তার কিশোরকবিতায়।
আয়রে আমার ছেলেবেলা
আয়রে আমার ছেলেবেলা, আয়রে ফিরে আয়।
টাপুর টুপুর বর্ষা-নূপুর পরিয়ে দেব পা-য়।
আকাশ থেকে পূর্ণিমা চাঁদ
সাগর থেকে মানিক
সূর্য থেকে রোদের কণা খানিক
তোর দু’হাতের মুঠোয় দেব তুলে,
সুযোগ পেয়ে আমিও হব আবার বাউন্ডুলে।
আয়রে আমার ছেলেবেলা, আয়রে ফিরে আয়
বুকের ভেতর বয়েসভাঙা ঝরনা বয়ে যায়।
সকাল-বিকেল নিয়ম মাফিক
এই যে জীবনযাপন
একটুও নেই ঢেউ-তরঙ্গ, একটুও নেই কাঁপন,
এমন বয়েস ফিরিয়ে দেয়াই ভালো-
ইচ্ছে-মেঘের বিজলি মনে সহসা চমকালো।
আয়রে আমার ছেলেবেলা, আয়রে ফিরে আয়
চাইনে প্রতিপত্তি আমি, কুড়োল দেব পায়।
ফিরিয়ে দেব কাজের তাড়া
ফিরিয়ে দেব নাম,
‘খোকা’ বলেই ডাকুক সবাই, খোকনই থাকলাম।
এমন বড় কেউ যেন না হয়-
চতুর্দিকে শত্রু ঘোরে দিগি¦দিকে ভয়।
আবু হাসান শাহরিয়ারের লেখালেখির শুরু স্কুলে থাকতে, ছড়া দিয়ে। পরবর্তীতে যখন লেখালেখির অঙ্গনে ব্যাপকভাবে প্রথম পরিচিতি পান, তাও ছড়ার মাধ্যমে। সত্তর আর আশির দশকে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের অঙ্গনে নতুন যে বাঁকের সৃষ্টি হয় তা একদল তরুণ শিশুসাহিত্যিকের মাধ্যমে। সেই বাঁকবদলের সৈনিক হিসেবে যারা ছিলেন তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবু হাসান শাহরিয়ার। আবু হাসান শাহরিয়ার, লুৎফর রহমান রিটন, ফারুক নওয়াজ, সুজন বড়ুয়া, সৈয়দ আল ফারুক, ফারুক হোসেন, আমীরুল ইসলাম, আসলাম সানী, আনওয়ারুল কবীর বুলু, সৈয়দ নাজাত হোসেন, রোকেয়া খাতুন রুবী, শাহাবুদ্দীন নাগরী, সবাই ছিলেন সেই সময়ের উজ্জ্বল ছড়াকার। ছড়ার জগতের এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে সে সময়ে। সারা দেশে এসেছিল ছড়ার নতুন জোয়ার। ছড়াকে এক নতুন মাত্রায়, নতুন অবস্থানে নিয়ে এসেছিলেন তারা। কিছু মানুষ যারা ছড়াকে একসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো, ছড়াকে বাঁকা চোখে দেখতো তারাও তখন মনোযোগী দৃষ্টি দিয়েছিলেন ছড়ার দিকে।
ছড়া দিয়ে লেখালেখির শুরু হলেও কিন্তু আবু হাসান শাহরিয়ারের প্রথম বই ছোট গল্পের। নাম ‘আসমানি সাবান’ যা প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে। গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন। অনেকেই বলেছেন, ‘তোমার ছড়া বেশ লাগে, ছড়ার বই বের না করে আগে গল্পের বই করলে যে!’ এরপর গ্লোব লাইব্রেরি থেকে তার দ্বিতীয় বইটি যেটা প্রকাশিত হলো সেটা তার প্রথম ছড়ার বই। নাম ‘পায়ে নূপুর’। প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সালে। এ বই বিষয়ে বলতে গিয়ে আবু হাসান শাহরিয়ার এক জায়গায় লিখেছেন, মজার আখ্যান। আমি তার কিছুটা আপনাদের পড়ে শোনাচ্ছি। শিল্পী আফজাল হোসেন অপূর্ব প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছিলেন বইটির। ছাপাখানায় তখন অফসেট যুগ সবে আসি-আসি করছে। জিঙ্কের ব্লকেই বাইকালারে অফসেটের মতো ছাপা সেই অলংকরণ। প্রচ্ছদ অফসেটে। খুবই দরদ দিয়ে কাজ করায় প্রচ্ছদে গ্রন্থকারের সমান মর্যাদা দিয়ে ছাপা হয়েছিল আফজাল হোসেনের নাম। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র তখন বইয়ের মুদ্রণ পারিপাট্যের জন্য শিল্পীদের পুরস্কৃত করতো। আফজাল হোসেন পুরস্কৃত হলেন ‘পায়ে নূপুরের’ জন্য। এর দু’এক বছর আগ থেকে ‘অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার’ দেয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিও। ছড়াকবি লুৎফর রহমান সরকার তখন অগ্রণী ব্যাংকের উচ্চকর্তা। আবু হাসান শাহরিয়ারকে স্নেহ করতেন তিনি। পরামর্শ দিলেন বইটি শিশু একাডেমিতে জমা দিতে। জমা দিলেন শাহরিয়ার। কিন্তু না, পুরস্কার পেলো না ‘পায়ে নূপুর’। একদিন শিশু একাডেমির পরিচালক জোবেদা খানমের সঙ্গে দেখা হলে তিনি কাছে ডেকে মাতৃস্নেহে তাকে বললেন, ‘আমরা সবাই ভেবেছিলোাম, তোমার ছড়ার বইটাই পুরস্কার পাবে এ বছর, কিন্তু জুরিদের একজন আপত্তি তুললেন, ‘বইটা তো শুধু শাহরিয়ারের নয়, আফজাল হোসেনেরও’। তাই দেয়া গেলো না পুরস্কার।’ শুনে বলতে চেয়েও বলতে পারেননি শাহরিয়ার, ‘আফজাল হোসেনকে ইলাস্ট্রেশনের জন্য পুরস্কার দেয়ার ক্ষেত্রে ‘বইটি তো শাহরিয়ারেরও’ এই প্রশ্ন ওঠেনি গ্রন্থকেন্দ্রে।’ ফজলে রাব্বী তখন গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক এবং শিশু একাডেমিতে আমাকে পুরস্কার দেয়ার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিলেন শিশুসাহিত্যিক সরদার জয়েন উদ্দীন। দ্বিতীয়জন ছড়াও লিখতেন। ‘পায়ে নূপুর’ প্রকাশিত হওয়ার পর এ বইটির ওপর একটি অসামান্য রিভিউ লিখেছিলেন কবি আল মাহমুদ। সেখানে তিনি তাকে কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন ‘দস্যু দুপুর’সহ কয়েকটি ছড়ার জন্য। রিভিউটি কবি রফিক আজাদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক সাহিত্যের আয়োজনে ছাপা হয়েছিল। ছড়ার বই বের করেই কবি স্বীকৃতি! তা-ও কিনা আল মাহমুদের মতো কবির কাছ থেকে! আপ্লুত হয়েছিলেন তিনি। ওই বইয়ের ‘ঘড়ি’ শিরোনামের ছড়াটিও স্মৃতিবহ। বাংলাদেশ স্কুল টেক্সট বুক বোর্ডের তৎকালীন সচিব ছড়াকবি আবদার রশিদ স্কুলপাঠ্য বইয়ে ছড়াটি অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শাহরিয়ারের বাবা তখন ওই বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং তিনি আপত্তি করেছিলেন, ‘আমি যতক্ষণ এখানে আছি, আমার ছেলের লেখা বোর্ডের কোনো বইয়ে যাবে না। ওর যদি যোগ্যতা থাকে, যখন আমি এখানে থাকবো না, তখন ওর লেখা পাঠ্যপুস্তকে ছাপা হবে।’ পরবর্তীতে আবু হাসান শাহরিয়ার বলেছেন, ”সেই যোগ্যতা বোধহয় এখনো হয়নি আমার। না, এজন্য কোনো আক্ষেপ নেই আমার। তবে বাবার সেদিনের সিদ্ধান্তের জন্য আজও আমি গর্ববোধ করি।” শাহরিয়ারের কিশোরকবিতার বই আয়রে আমার ছেলেবেলা প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। এই তিনটি তার ছোটদের প্রকাশিত গ্রন্থ। তার একটি ছড়া-
একটিবারও
আমরা ছোট তোমরা বড়ো
সুযোগ পেলেই শাসন করো
খেলার সময় হলেও বলো
সমাজ পড়ো, ভূগোল পড়ো।
রোজতো পড়িই তারপরও ফের
ইসকুলে যাই, সেটাইতো ঢের
তাই বলে কি তোমরা ভাবো
আর কোনো কাজ নেই আমাদের?
আমরা যদি না যাই মাঠে
মাঠের কি আর সময় কাটে?
মাঠ আমাদের ডাক পাঠালে
কি করে মন বসাই পাঠে?
আকাশ কখন একলা কাঁদে
সব জেনেছি দাঁড়িয়ে ছাদে
থাকলে ঘুড়ি, থাকলে লাটাই
কান্না থামাই সুসংবাদে।
তোমরা বড়ো হওনা আরো
তাই বলে কি একাই পারো?
কাজের সময় আর আমাদের
বাধ সেধো না একটিবারও।
বন্ধুদের প্রতি তার আছে এক ধরনের অপ্রকাশিত ভালোবাসা, যা মুখে তিনি অনেকসময় প্রকাশ করেন না। প্রকাশ করেন তার লেখায়। ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রয়াত ছড়াকার সৈয়দ নাজাত হোসেনের বই হাত ঝুম ঝুম পা ঝুম ঝুম এর ভূমিকা পর্বে আবু হাসান শাহরিয়ার লিখেছেন --
‘পথে- পথে বাঁক নিলেও আজকের বাংলা ছড়া বহু-বহু যুগের বহুরৈখিক উত্তরাধিকার বহন করছে। যাদের ছড়ার অন্তঃশীলে সেই বহুরৈখিকতার ঢেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বহমান, সৈয়দ নাজাত হোসেন তাদের অন্যতম’।
শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলামের সাথে যৌবনের দিনগুলোতে ছিল শাহরিয়ারের বেশ সখ্যতা। আমীরুল ইসলামের বাড়িতে অনেকবার গেছেন তিনি। শ্রদ্ধা করতেন আমীরুল ইসলামের মাকে প্রচণ্ড। শুনেছি আমীরুল ইসলামের মাকে নিয়ে তিনি কয়েকটি ছড়া লিখেছিলেন। ছড়াটি সংগ্রহের অনেক চেষ্টা করেছি আমি, পারিনি। পারলে আজ শোনানো যেতো সেই ছড়া।
প্রয়াত ছড়াকার নাসের মাহমুদের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা ছিল আবু হাসান শাহরিয়ারের। তাইতো নাসের মাহমুদের জন্মদিনে লিখেছিলেন অবিস্মরণীয় এক ছড়া।
বাস, আস্তে আস্তে যাস
লালন থাকে ছেউড়িয়াতে
কাছেই থাকে নাসের
ওদের টানে
একসকালে
টিকিট কাটি বাসের।
বাস
আস্তে আস্তে যাস।
আকাশজোড়া মেঘের ভেলা
এখন আষাঢ় মাস
বাস
আস্তে আস্তে যাস
মেঘে মেঘেই বয়স আমার
ছুঁয়েছে পঞ্চাশ
বাস
আস্তে আস্তে যাস
আস্তে আস্তে যাস।
এই লেখাটি আপাত দৃষ্টিতে ছড়া মনে হলেও এটি একটি জীবনধর্মী কবিতা। মানব জীবনের একটি অনবদ্য দার্শনিক চিত্র। যার উপকরণ হচ্ছে লালন, নাসের, আকাশ, মেঘ, আষাঢ় মাস। যে কবিতায় বাস হচ্ছে একটি প্রতীকী চরিত্র। এই বাস হচ্ছে মানুষের জীবন। সেই জীবনবাসের টিকিট কেটেছেন লেখক। পঞ্চাশ ছুঁয়ে যাওয়া লেখক জীবন নামের এই বাসের এর প্রতি আকুতি জানাচ্ছেন বারবার। বাস, তুই আস্তে আস্তে যাস। তার সৃষ্টিকর্মের এখনও অনেক কিছু বাকী আছে তাই জীবন যেন আস্তে আস্তে হাঁটে।
সংগঠকজীবন
আবু হাসান শাহরিয়ারের সংগঠক জীবনের কথা আসলেই অনিবার্যভাবে একজনের নাম এসে যায়। তিনি হচ্ছেন তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী কবি ও শিশুসাহিত্যিক সৈয়দ আল ফারুক। আশির দশকে আবু হাসান শাহরিযার আর সৈযদ আল ফারুকের নেতৃত্বে জন্ম হয় শিশুসাহিত্য পরিষদ। মূলত: এই দুজনের মধ্য দিয়েই সংগঠনটির জন্ম ও বিকাশ। শিশুসাহিত্যিক সালেম সুলেরীও ছিলেন সংগঠকদের একজন। দর্শনীর বিনিময়ে ছডা পাঠের আসর, বিভিন্ন কল্যাণকর্ম, সাহিত্য ভ্রমণ, অরণ্যভোজন, সাহিত্য-আড্ডা ছিলো সংগঠনের নিযমিত কর্মসূচি। শিশুসাহিত্য বিষয়ক সেমিনারও ছিলো কার্যক্রমের বড় একটি অংশ। বাংলাদেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে ছডা পাঠের আসর করেছিল শিশুসাহিত্য পরিষদ।
শিশুসাহিত্য পরিষদ থেকে দুটি দর্শনীর বিনিময়ে ছড়া পাঠের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রথমটি হয়েছিল ১৯৮২ সালের ১৬ মে। দ্বিতীয় অনুষ্ঠানটি হয়েছিল একই বছর ১৮ ডিসেম্বরে। প্রথম অনুষ্ঠানে যাঁরা ছড়া পড়েছিলেন তারা হচ্ছেন কবি শামসুর রাহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আল মাহমুদ, আতোয়ার রহমান, আবদার রশীদ, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন, লুৎফর রহমান সরকার, সুকুমার বড়ুয়া, রফিকুল হক, আসাদ চৌধুরী, অরুণাভ সরকার, আল মুজাহিদী, শামসুল ইসলাম, সিকদার আমিনুল হক, ইমরান নূর, আবু সালেহ, আখতার হুসেন, হাসান হাফিজ, আবু হাসান শাহরিয়ার, সৈয়দ আল ফারুক, রোকেয়া খাতুন রুবী, শামসুল হক দিশারী, মোখতার আহমেদ, আহমাদ উল্লাহ, আমীরুল ইসলাম, মোহাম্মদ মারুফুল, ফারুক হোসেন, আহমাদ মাযহার ও মোশতাক আহমেদ। যার দেখাদেখি সে সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল অসংখ্য দর্শনীর বিনিময়ে ছড়া পাঠের আসর। সেসময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে রবিবাসরীয় সাহিত্য সংসদের উদ্যোগেও অনুষ্ঠিত হয়েছিল দর্শনীর বিনিময়ে ছড়া ও কবিতা পাঠের আসর। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আমি হাসনাত আমজাদ ছিলাম রবিবাসরীয় সাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক আর তসিকুল ইসলাম রাজা ছিলেন সংগঠনের সভাপতি।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দে তিন মাত্রার চালে কয়েকটি ব্যতিক্রমধর্মী ছড়া লিখেছিলেন আবু হাসান শাহরিয়ার। তিন মাত্রার এমন ছড়া সচরাচর চোখে পড়ে না। দারুণ সব ছড়াগুলো, যার একটি নিচে উল্লেখ করা হলো।
ঝগড়া
দুদোটো মোরগ যোয়ান তাগড়া
কেবলি ঝগড়া কেবলি বাগড়া
ঠোকরে ঠোকরে দাগড়া দাগড়া।
লড়াই উঠোনে লড়াই খোয়াড়ে
খোকাও ভাসালো নিজেকে জোয়ারে।
তুমুল লড়াই গোঁয়ারে গোঁয়ারে।
মা বলে বিপদ লেগেছে বাড়িতে
খোকাও জড়িত এ মারামারিতে
বরং দুটোকে চড়াই হাঁড়িতে।
ফেসবুকের ছড়াকারদের গ্রুপ গোলপাতার ছাউনিতে শাহরিয়ার একসময় প্রচুর সময় দিতেন, এখনও মাঝে মাঝে উঁকি দেন সময় পেলে। এই গ্রুপের অ্যাডমিন মাহবুবা হক কুমকুম এবং সৈয়দ সায়েম। দুজনই ছড়া লেখেন। ২৫ জুন ২০১৩ তে আবু হাসান শাহরিয়ারের জন্মদিনে গোলপাতার ছাউনি প্রকাশ হয়েছিলো এক ছড়া অ্যালবাম। তাতে বাংলাদেশের প্রায় ৩৫ জন শিশুসাহিত্যিক ৪ লাইনের ছড়া লিখেছিলেন। আমার লেখাও একটা ৪ লাইনের ছড়া সেখানে ছিল-
আয়রে আমার ছেলেবেলা এবং পায়ে নুপুর
কাটত পড়ে আমার অনেক দীর্ঘ অলস দুপুর
আবু হাসান শাহরিয়ারের এসব ছড়ার বই
দেয় ফিরিয়ে কৈশোর দিন, বইগুলো আজ কই?
বনসাই জীবন না কাটিয়ে বট পাকুরের বিশাল হতে চাওয়া আকাঙ্ক্ষা এক কিশোরের। সেই কিশোর আবু হাসান শাহরিয়ার। এই বিষয় নিয়ে তার কিশোরকবিতা।
ইচ্ছে জে¦লে জে¦লে
কোথাও একটা রাতজাগা মন আছে
পদ্মা কিংবা মেঘনা কিংবা কর্ণফুলির কাছে।
কোথাও একটা পাহাড়
আকাশজোড়া জোৎস্না পেয়ে খোলে রূপের বাহার।
কোথাও একটা মাঠ
আজ ফোটাচ্ছে ঘাটফুল তো কাল ফোটাচ্ছে ভাট।
কোথাও একটা খাতা
চৈত্র মাসের রোদ ঠেকাতে আঁকছে মেঘের ছাতা।
মেঘের ভাঁজে ভাঁজে
দূরের কোথাও শ্রাবণ আজও মন্দিরাতে বাজে।
দূরে কোথাও আরো দূরের গান
উত্তাল এক সমুদ্রে কেউ ভাসাচ্ছে সাম্পান।
তানপুরাতে মাঘনিশীথের পাখি
বলছে আমি যাচ্ছি ট্যুরে তুমিও যাবে নাকি?
ঘুম ডাকে আয় আয়
সবাই ঘুমের বাড়ি যায়
আমি ইচ্ছে জে¦লে জে¦লে
ঘুরি রাতের পাড়াগাঁয়
ওরা না জ¦লতেই ছাই
চেনে কেবল নিজের বিছানাই
আমি বট পাকুড়ের ছেলে
টবে হব না বনসাই।
রাজশাহী এবং আমার সাথে আবু হাসান শাহরিয়ারের সম্পৃক্ততা
কিছু ব্যক্তিগত কথা না বললেই নয়। কারণ, এই ব্যক্তিগত কথার সাথে কবি ও শিশুসাহিত্যিক আবু হাসান শাহরিয়ারের বেশ সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭৭ সালের শেষদিকে আমার লেখালেখি জীবনের শুরু। সেসময় রাজশাহীতে দৈনিক বার্তাকেন্দ্রিক শিশুকিশোর সংগঠন কিশোরকুঁড়ির মেলার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত শিশুসাহিত্যিক সৈয়দ নাজাত হোসেন। আমিও যুক্ত ছিলাম কিশোরকুঁড়ির মেলার সাথে। সংগঠনের সূত্রে আমার সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব তৈরি হয় সৈয়দ নাজাত হোসেনের সাথে। নাজাতের মাধ্যমেই আমার ছড়া লেখার হাতেখড়ি হয়। সৈয়দ নাজাত ছিল আমার যেমন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তেমনি ছিল আমার ছড়াগুরু। সৈয়দ নাজাত হেসেন নামের মানুষটির সাথে আমার পরিচয় ও বন্ধুত্ব না হলে লেখক হাসনাত আমজাদের জন্ম হতো কিনা আমি খুব সন্দিহান। সৈযদ নাজাত হোসেনের সাথে তখন সারা বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যিকদের যোগাযোগ ছিল। সেই সূত্রে কিশোরকুড়ির মেলার পাতায় তারা নিয়মিত লিখতেন। তাদের সাথে ছিল নাজাতের নিয়মিত চিঠিপত্রের যোগাযোগ। আমার তখন লেখালেখিতে দারুণ উৎসাহ। মুদ্রিত লেখা ছাপা হতো দৈনিক বার্তার পাতায়, সেইসাথে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে। ঠিক সেই সময় একদিন রাজশাহীতে এলো আবু হাসান শাহরিয়ার। রাজশাহীতে নাজাত তখন তার ঘনিষ্ঠ ব›ধু। আমিও নাজাতের সূত্রধরে আবু হাসান শাহরিয়ারের শাহরিয়ারের সাথে পরিচিত হলাম। আমি তখন ছড়ার জগতের নতুন বাসিন্দা, আর আবু হাসান শাহরিয়ার সেই বয়সেই অত্যন্ত পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত ছড়াকার। শাহরিয়ারের মেধা, প্রাণখোলা হাসিখুশি বৈশিষ্ট্য আর আন্তরিকতায় কেন জানি প্রথম পরিচয়েই শাহরিয়ারের সাথে আমার একটা বেশ কাছের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেলো। ভালো লেগে গেলো তাকে। এরপর রাজশাহীতে নিয়মিত আসতে শুরু করলো সে। মাঝে মাঝে তার সাথে আসতো সৈয়দ আল ফারুক। তখন শাহরিয়ারের তরুণ বয়স। সেসময় খুবই হৈ হৈ করতো সে। দুমদাম করে ছড়া লিখে ফেলতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছড়া নিয়ে কথা বলতে পারতো। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। ক্রমে ক্রমে আমারও লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ততা তখন অনেক বেড়ে গেছে। রাজশাহীর অন্যতম সাহিত্য সংগঠন রবিবাসরীয় সাহিত্য সংসদের আমি সাধারণ সম্পাদক। প্রতি রোববার শহরের সোনাদীঘির মোড়ে বসে রবিবাসরীয় সাহিত্য সংসদের সাহিত্য সভা। রাজশাহী এলে শাহরিয়ারও সেই সাহিত্য সভায় নিয়মিত আসতো। রাজশাহীতে আসতো সে আর একজনের টানে। সে হচ্ছে মনিরা কায়েস। মনিরার সাথেও আমারও ছিল বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আমরা তিনজন একসাথে অনেক আড্ডা দিয়েছি। আর একজন থাকত আড্ডায়। সে প্রয়াত কবি নাসিমা সুলতানা। ঢাকায় এলেই দেখা হতো শাহরিয়ারের সাথে। সেসময় লেখালেখির ব্যাপারে আমি প্রচুর উৎসাহ আর সহযোগিতা পেয়েছি শাহরিয়ারের কাছে। মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হওয়ার পর শাহরিয়ারের শ্যামলীর বাসায় আমি একবার একটানা প্রায় একমাস ছিলাম। তখন শাহরিয়ারের সাথে মনিরার বিয়ে হয়ে গেছে। এরপর সে যখন বাসা চেঞ্জ করে টিকাটুলীতে গেলো সেই বাসাতেও একবার আমি টানা একমাসের বেশি ছিলাম। ওর ঘরভর্তি বই ছিল। সেই বইগুলো বসে বসে পড়তাম সারাদিন। মাঝখানে অনেক বছর আমার সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না শাহরিয়ারের । আমি তখন চাকরিসূত্রে নোয়াখালী, হবিগঞ্জ, পাবনা, নীলফামারী এসব জায়গায় অবস্থান করি। লেখালেখি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এরপর রংপুরে যখন আমি, সেসময় হঠাৎ একদিন আমার অফিসের টিএন্ডটি নাম্বারে শাহরিয়ারের ফোন। তখন ২০০০ সাল। আমি তখন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আশা-র ডিভিশনাল ম্যানেজার। আপনারা সবাই জানেন শাহরিয়ার খুব স্পষ্টবাদী এবং কথাবার্তার মধ্যে কোনো রাখঢাক নেই। আমাকে ফোন করে গম্ভীরভাবে বললো, মানুষ আর পশুর সাথে বিশেষ পার্থক্য কি জানিস? পশু শুধুমাত্র খাদ্য সংগ্রহ আর সন্তান উৎপাদন কাজে ব্যস্ত থাকে। তুইও পশু হয়ে গেছিস। কারণ, লেখালেখির সাথে তোর কোনো সম্পর্ক নাই, শুধু জীবিকা আর সন্তান উৎপাদন কাজে তুই যুক্ত আছিস। আমি হা হা করে হেসে বললাম, ঠিক বলেছিস দোস্তো। এ ব্যাপারে তোর সাথে আমার কোনো দ্বিমত নেই।
পরবর্তীতে শাহরিয়ারের সাথে আমার আবার যোগাযোগ তৈরি হয়। শাহরিয়ারের প্রতি আমার আরো কিছু ব্যক্তিঋণ রয়েছে, যা উল্লেখ না করলেই নয়। আমার প্রথম বই- মাঠের ছবি ঘাটের ছবি-র পুরো পাণ্ডুলিপি শাহরিয়ার অত্যন্ত ধৈর্য্যসহকারে দেখে পান্ডুলিপির অনেক সংশোধন করে দিয়েছিল। আমার এই বইটির জন্য আমি পরবর্তীতে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলাম। পেয়েছিলাম অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শিশুসাহিত্য পুরস্কার।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আবু হাসান শাহরিয়ারের উল্লেখযোগ্য ছড়া- বাতিঘর। যে লেখায় তিনি জাতির জনককে বাতিঘরের সাথে তুলনা করেছেন।
বাতিঘর
সাত মার্চের বজ্রকণ্ঠে উত্তাল কোটি মন
ছাব্বিশে মার্চ আসে স্বাধীনতা, যে বানী চিরন্তন।
শত বর্ষের শত সংগ্রাম, কত না চোখের জল
একটিমাত্র বারুদকন্ঠে হয়ে ওঠে দাবানল।
সেই দাবানলই মুক্তিযুদ্ধ, শাশ্বত বাতিঘর
আজও তাই কেটি অন্তরে বাজে মুজিবর মুজিবর।
আবু হাসান শাহরিয়ারের সুযোগ্য জীবনসঙ্গিনী মনিরা কায়েস। আবু হাসান শাহরিয়ারের যেমন রয়েছে সাহিত্য বিষয়ক বিস্তর পড়াশোনা ঠিক তেমনি পড়াশোনা রয়েছে মনিরা কায়েসের। আর পড়াশোনা আছে বলেই শাহরিয়ারের লেখার মতো তার লেখালেখিরও প্রচুর ধার। বাংলাদেশের গদ্যসাহিত্য আলোচনা করতে গেলে মনিরা কায়েস একটি আবশ্যকীয় নাম হিসেবে আসতে হবে। সেই আশির দশকে যখন সাপ্তাহিক বিচিত্রা ছিল প্রথম শ্রেণির অন্যতম সাময়িকী, যেখানে যাদের লেখা ছাপা হতো তাদেরকে অন্য লেখকরা ঈর্ষার চোখে দেখত। সেই সময় শাহরিয়ারের পাশাপাশি মনিরা কায়েসের গল্পও ছাপা হতো বিচিত্রায়। মনিরা কায়েস খুব কম লেখেন কিন্তু লেখার ভার অনেক। মনিরা কায়েসও বড়দের পাশাপাশি ছোটদের জন্য অনেক লিখেছেন। তার ছড়া, বিশেষ করে সমকালীন ছড়া উল্লেখযোগ্য। ছোটদের গল্পও রয়েছে তার প্রচুর। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছোটদের বই হচ্ছে- ভূতের আমি ভূতের তুমি এবং সত্যি ভূতের গল্প ।
শাহরিয়ারের জীবনসঙ্গিনী মনিরা কায়েসের কাছ থেকে জেনেছি, প্রচুর ছড়া ও কিশোরকবিতা রয়েছে তার, যেগুলো এখনো গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয়নি। শাহরিয়ার এখন ছোটদের জন্য লেখেনও খুব কম, লেখেন না বললেই চলে। বেশ কিছুদিন যাবত তিনি অসুস্থ। স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে অনেকটাই দুর্বল এখন তিনি। যদিও অসুখ তার মনকে দুর্বল করতে পারেনি মোটেও। মনে আছে, বেশ কিছুদিন আগে আবু হাসান শাহরিয়ারের সাথে দেখা হয়েছিল রাজশাহীতে। শাহরিয়ারের কৈশোরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছড়াকার আতাউল করিম শফিক দেশের বাইরে থেকে দেখা করতে এসেছিল শাহরিয়ারের সাথে। সাথে ছিলেন লেখক মনজুরুর রহমান। রাজশাহীতে পদ্মার পাড়ে আমরা একসাথে কাটিয়েছিলাম একটা পুরো বিকেল। সেসময়ও সে অসুস্থ ছিল। কিন্তু তাকে দেখে মোটেও অসুস্থ মনে হয়নি। আগের মতোই প্রচণ্ড মনোবল নিয়ে আড্ডা দিয়েছে সবার সাথে।
আবু হাসান শাহরিয়ারের যে লেখাগুলো এখনো মুদ্রিত আকারে প্রকাশ পায়নি, তা অতিদ্রুত প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। বাংলাভাষার শিশুসাহিত্যকে আরো অনেক অনেক সমৃদ্ধশীল করার জন্য শাহরিয়ারের এই লেখাগুলো পাঠকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন, কবিতার পাশাপাশি আবু হাসান শাহরিয়ারের নতুন নতুন অনেক ছড়া আর কিশোরকবিতা। যে ছড়া-কবিতা দিয়ে শাহরিয়ারের লেখালেখির জীবন শুরু, সেই ছড়াকে কোনোভাবেই বাদ দিতে পারেন না তিনি। শাহরিয়ার আরো অনেক অনেক শিশুতোষ আর কিশোরতোষ লেখা লিখবেন শিশুসাহিত্যের জন্য, আমাদের শিশুকিশোরদের জন্য, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখাটি হাসনাত আমজাদের ‘ছড়ানো গদ্য’ প্রবন্ধগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।
