ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৫:২৬:৫৯ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

হায় জীবন, মায়ের মরদেহের পাশে পচে যায় মানবিকতা!

আইরীন নিয়াজী মান্না

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০২:২২ পিএম, ৩ জুন ২০২৬ বুধবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায় কয়েক দিন ধরে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিলেন এক বৃদ্ধা মা। ঘরের ভেতর তাঁর মরদেহে পচন ধরেছে, প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে বিষয়টি জানতে পেরেছেন। পরে জানা গেল, তাঁর ছেলে একজন যুগ্ম-সচিব পদমর্যাদার সরকারি কর্মকর্তা। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থাই কি এই ঘটনার যথাযথ উত্তর? নাকি এর চেয়েও বড় কোনো সামাজিক ব্যর্থতার মুখোমুখি আমরা দাঁড়িয়ে আছি?

একজন মানুষের মৃত্যু নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক। কিন্তু একজন মায়ের মৃত্যু যদি এমন নিঃসঙ্গ, এমন অবহেলিত এবং এমন করুণ হয়, তবে তা কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি থাকে না; তা পুরো সমাজের নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যে মা সন্তানের জন্য নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন, নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন, বার্ধক্যে এসে তাঁর পরিণতি যদি হয় নিঃসঙ্গ মৃত্যু এবং পচন ধরা মরদেহ, তাহলে আমাদের সভ্যতার বাহ্যিক চাকচিক্য কতটা অর্থহীন হয়ে পড়েছে, সেটিই সামনে আসে।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মানুষের আর্থিক সাফল্যকে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হয়। পদ-পদবি, ক্ষমতা, অর্থ, গাড়ি-বাড়ি—সবকিছুর পেছনে ছুটতে ছুটতে অনেকেই সম্পর্কের উষ্ণতা হারিয়ে ফেলছেন। পরিবার একই ছাদের নিচে থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার বন্ধু থাকলেও বাস্তব জীবনে মানুষ ক্রমেই একা হয়ে পড়ছে। বৃদ্ধ মা-বাবারা অনেক সময় সংসারের বোঝা হয়ে যান, তাঁদের আবেগ-অনুভূতি গুরুত্ব হারায়। এই ঘটনাটি সেই নির্মম বাস্তবতারই এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

এখানে বিষয়টি শুধু একজন যুগ্ম-সচিবের নয়। তিনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেই ঘটনাটি আলোচনায় এসেছে। কিন্তু দেশের নানা প্রান্তে কত বৃদ্ধ মা-বাবা নিঃসঙ্গতায় দিন কাটাচ্ছেন, কতজন অবহেলা আর মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে বেঁচে আছেন, তার কোনো হিসাব নেই। অনেকেই সন্তানের সংসারে থেকেও পরবাসীর মতো জীবন কাটান। কেউ কেউ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করেন—একটি খোঁজ নেওয়ার জন্য, একটি আন্তরিক কথার জন্য, একটি স্পর্শের জন্য।

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক বন্ধনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। যৌথ পরিবার ভেঙেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে, নগরায়ণ বেড়েছে—এসব পরিবর্তন স্বাভাবিক। কিন্তু পরিবর্তনের নামে যদি দায়িত্ববোধই হারিয়ে যায়, তবে তা অগ্রগতি নয়, বরং সামাজিক অবক্ষয়। সন্তান হিসেবে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব কোনো আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয় নয়; এটি মানবিকতার প্রশ্ন। আইন শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু মমতা সৃষ্টি করতে পারে না।

এই ঘটনায় রাষ্ট্র যদি দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পায়, তাহলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিজীবনও সমাজের জন্য একটি বার্তা বহন করে। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে, এমন ঘটনা কেন ঘটছে? কেন একজন মানুষ তাঁর সবচেয়ে আপনজনের প্রতিও এতটা উদাসীন হয়ে উঠছেন? এর উত্তর খুঁজতে হবে পরিবার, শিক্ষা এবং সামাজিক মূল্যবোধের ভেতরে।

শিশুদের আমরা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রতিযোগিতা—সবকিছু শেখাচ্ছি; কিন্তু কৃতজ্ঞতা, সহমর্মিতা এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধ কতটা শেখাচ্ছি? যে সমাজে সাফল্যের সংজ্ঞা কেবল অর্থ ও পদমর্যাদায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, সেখানে মানবিকতার জায়গা সংকুচিত হওয়াই স্বাভাবিক। অথচ একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর পদবিতে নয়, তাঁর আচরণে; ক্ষমতায় নয়, তাঁর দায়িত্ববোধে।

একজন মায়ের পচন ধরা মরদেহ আমাদের সামনে একটি ভয়াবহ প্রশ্ন রেখে গেছে—আমরা কি সত্যিই আধুনিক হচ্ছি, নাকি কেবল মানবিকতা হারানোর নতুন নতুন কৌশল শিখছি? যদি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেক মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের একই আক্ষেপ করতে হবে—পচে গেছে শুধু একটি দেহ নয়, পচে গেছে আমাদের বিবেকও।