ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৫:২৬:৫৯ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

সোনা: পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ধাতুর গল্প

অনু সরকার

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৭:৩৩ পিএম, ৩ জুন ২০২৬ বুধবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

মানুষের ইতিহাসে এমন কোনো ধাতু নেই, যা সোনার মতো এত আকর্ষণ, ক্ষমতা, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। হাজার হাজার বছর আগে মিশরের ফারাওদের যুগ থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতি—সোনা এখনও সম্পদ, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতীক। কিন্তু সোনা আসলে কী? কেন এর দাম প্রতিদিন ওঠানামা করে? কোথা থেকে আসে এই সোনা? আর পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সোনা রয়েছে কোন দেশে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

সোনা আসলে কী?

সোনা একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক মৌল। এর প্রতীক Au, যা এসেছে ল্যাটিন শব্দ Aurum থেকে। এটি হলুদাভ উজ্জ্বল, মরিচা ধরে না, সহজে নষ্ট হয় না এবং অত্যন্ত নমনীয়।

এক গ্রাম সোনা টেনে প্রায় দুই কিলোমিটার লম্বা তার বানানো সম্ভব। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই প্রাচীনকাল থেকে সোনা মানুষের কাছে মূল্যবান।

সোনার জন্ম কোথায়?

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোটি কোটি বছর আগে মহাবিশ্বে বিশাল নক্ষত্র বিস্ফোরণ (সুপারনোভা) এবং নিউট্রন তারার সংঘর্ষে সোনার সৃষ্টি হয়েছিল। পরে সেই সোনা পৃথিবীর গঠনের সময় ভূগর্ভে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ, আপনার গলার হার বা আঙুলের আংটির সোনা আসলে মহাজাগতিক বিস্ফোরণের ফসল!

সোনা কোথা থেকে পাওয়া যায়?

সাধারণত তিনভাবে সোনা পাওয়া যায়—

১. খনি থেকে

এটাই সবচেয়ে বড় উৎস। পাহাড় বা মাটির গভীরে থাকা সোনাযুক্ত শিলা খনন করে সোনা বের করা হয়।

২. নদীর বালু থেকে

অনেক নদীর তলদেশে ক্ষুদ্র সোনার কণা জমা থাকে। বিশেষ পদ্ধতিতে বালু ধুয়ে সেগুলো সংগ্রহ করা হয়।

৩. পুরোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্র থেকে

মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, চিপসেটসহ বিভিন্ন যন্ত্রে অল্প পরিমাণ সোনা থাকে। বর্তমানে এগুলো পুনর্ব্যবহার করেও সোনা আহরণ করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি সোনা উৎপাদন করে কোন দেশ?

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোনা উৎপাদনকারী দেশ হলো:

১. চীন
২. রাশিয়া
৩. অস্ট্রেলিয়া
৪. কানাডা
৫. যুক্তরাষ্ট্র

একসময় দক্ষিণ আফ্রিকা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোনা উৎপাদনকারী দেশ। তবে খনির উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখন সে অবস্থান হারিয়েছে।

সবচেয়ে বড় সোনার খনি কোথায়?

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনার খনি হলো গ্রাসবার্গ খনি, যা ইন্দোনেশিয়া-তে অবস্থিত। এ ছাড়া মুরুনতাউ খনি (উজবেকিস্তান) এবং কার্লিন ট্রেন্ড-ও বিশ্বের বিখ্যাত সোনার খনি।

সবচেয়ে বেশি সোনা মজুত আছে কোন দেশের?

সরকারি রিজার্ভ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে সবচেয়ে বেশি সোনা রয়েছে—

১. যুক্তরাষ্ট্র – প্রায় ৮ হাজার টনের বেশি
২. জার্মানি
৩. ইতালি
৪. ফ্রান্স
৫. রাশিয়া

বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত সোনা সংরক্ষণাগার হলো ফোর্ট নক্স।

সোনার দাম ওঠানামা করে কেন?

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সোনার দাম নির্ভর করে মূলত চাহিদা ও সরবরাহের ওপর। তবে আরও কিছু বড় কারণ আছে।

১. ডলারের মূল্য

সোনার আন্তর্জাতিক দাম মার্কিন ডলারে নির্ধারিত হয়। ডলারের দাম কমলে সাধারণত সোনার দাম বাড়ে।

২. যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা

যখন যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট বা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, মানুষ নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা কেনে। ফলে দাম বেড়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে সোনার চাহিদা বেড়েছিল।

৩. মূল্যস্ফীতি

টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমলে মানুষ সোনা কিনে সম্পদ রক্ষা করতে চায়। তখন দাম বাড়ে।

৪. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রয়

বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ব্যাপক হারে সোনা কেনে, তখন দাম বাড়তে পারে।

৫. খনির উৎপাদন

উৎপাদন কমে গেলে বা নতুন খনি না পাওয়া গেলে সরবরাহ কমে যায়, ফলে দাম বাড়ে।

বাংলাদেশের বাজারে দাম কেন বদলায়?

বাংলাদেশে সোনার দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। বিশ্ববাজারের দামের পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় প্রভাব ফেলে— ডলারের বিনিময় হার, আমদানি খরচ, কর ও শুল্ক, স্থানীয় বাজারে চাহিদা, স্বর্ণ চোরাচালান ও সরবরাহ পরিস্থিতি। তাই অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে দাম না-ও কমতে পারে।

সোনা শুধু গয়নায় ব্যবহার হয়?

না। সোনার ব্যবহার অনেক বিস্তৃত।

গয়না শিল্প

বিশ্বে ব্যবহৃত সোনার সবচেয়ে বড় অংশ গয়না তৈরিতে যায়।

ইলেকট্রনিক্স

মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, স্যাটেলাইট এবং মহাকাশযন্ত্রে সোনা ব্যবহৃত হয়।

চিকিৎসা

কিছু বিশেষ ওষুধ, ডেন্টাল চিকিৎসা এবং চিকিৎসা যন্ত্রে সোনা ব্যবহৃত হয়।

মহাকাশ গবেষণা

মহাকাশযানের অংশবিশেষকে তাপ থেকে রক্ষা করতে সোনার আবরণ ব্যবহার করা হয়।

বিনিয়োগ

বার, বিস্কুট, কয়েন এবং ETF-এর মাধ্যমে সোনা বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম।

পৃথিবীতে মোট কত সোনা আছে?

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মানবসভ্যতা এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার টনের মতো সোনা উত্তোলন করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সব সোনা গলিয়ে একটি বিশাল ঘনক বানালে তার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা হবে মাত্র প্রায় ২২ মিটার!

শেষ কথা

মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনেক কিছুর মূল্য বদলেছে, অনেক সাম্রাজ্য এসেছে-গেছে। কিন্তু সোনার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কখনও কমেনি। কারণ সোনা শুধু একটি ধাতু নয়; এটি নিরাপত্তার প্রতীক, সম্পদের প্রতীক, কখনও ভালোবাসার, কখনও ক্ষমতার। তাই বিশ্ববাজারে প্রতিদিন এর দাম ওঠানামা করলেও মানুষের মনে সোনার মূল্য আজও অপরিবর্তিত।

হয়তো এ কারণেই বলা হয়—“সব চকচকে জিনিস সোনা নয়, কিন্তু সোনা সব সময়ই মানুষের চোখে সবচেয়ে বেশি চকচকে।”