বরিশাল জাদুঘর: অবহেলায় ঝুঁকিতে দুই শতকের ঐতিহ্য
বরিশাল প্রতিনিধি
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০১:১৭ পিএম, ৪ জুন ২০২৬ বৃহস্পতিবার
বরিশাল জাদুঘর
বরিশালের ঐতিহাসিক বিভাগীয় জাদুঘর এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে। দীর্ঘদিনের অবহেলা, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক উদাসীনতায় দুই শতাধিক বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সম্প্রতি সংঘটিত ভূমিকম্পের পর ভবনের পশ্চিমাংশের ছাদের কিছু ইস্পাতের বিম ও ইট-সুরকির কলামে ফাটল এবং দেবে যাওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুয়েটের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে কমিটি জানিয়েছে, ভবনের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়নে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এজন্য তারা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে আরও সময় চেয়েছেন।
ঐতিহাসিক এই ভবনটি ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই বছরের ৪ এপ্রিল প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে এর সংস্কার ও সংরক্ষণ কাজের উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু দুই বছরের প্রকল্প বাস্তবায়নে লেগে যায় প্রায় এক যুগ। শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘর।
তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ১৯৯৩ সালে বরিশাল প্রশাসনিক বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলেও আজও এ অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে খুলনা কার্যালয়ের হাতে। ফলে বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরসহ দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদ তদারকির দায়িত্বও পরিচালিত হচ্ছে খুলনা থেকে। স্থানীয়দের মতে, এ কারণেই দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, বরিশালের পুরাতন কালেক্টরেট ভবনটি নিম্ন গাঙ্গেয় অববাহিকায় নির্মিত ঔপনিবেশিক আমলের প্রথম প্রশাসনিক স্থাপনাগুলোর অন্যতম। ১৮০৩ সালে বাকেরগঞ্জ থেকে জেলা সদর বরিশালে স্থানান্তরের পর ১৮২১ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে ভবনটি নির্মিত হয়। পশ্চিমা ও ইন্দো-মুসলিম স্থাপত্যরীতির সমন্বয়ে নির্মিত এই ভবনটি শুধু প্রশাসনিক ইতিহাসই নয়, স্থাপত্য ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
দুই তলাবিশিষ্ট ভবনটিতে রয়েছে ২৩টি কক্ষ, বিস্তৃত বারান্দা, কাঠের সিঁড়ি, লোহার অলংকৃত রেলিং, স্কাইলাইট এবং সেই সময়ের ব্যবহৃত একাধিক সিন্দুক ও রেকর্ড সংরক্ষণের তাক। এসব বৈশিষ্ট্য ভবনটিকে অনন্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে জাদুঘরটির আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রদর্শনীর অভাব। প্রায় দেড় হাজার প্রত্ননিদর্শন সংরক্ষণের সুযোগ থাকলেও দক্ষিণাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কিংবা ১৯৭১ সালে বরিশালে প্রতিষ্ঠিত প্রথম যুদ্ধকালীন সচিবালয়ের কোনো স্মারক এখানে স্থান পায়নি।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসক খায়রুল কবির সুমন জাদুঘরটি পরিদর্শন করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্যালারি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় এ ধরনের প্রদর্শনী গড়ে তোলার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ভবনটির জরুরি সংস্কার ও সংরক্ষণের পাশাপাশি বরিশালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয় স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। জেলা প্রশাসকদের সাম্প্রতিক সম্মেলনেও বিষয়টি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নজরে আনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহকারী কাস্টডিয়ান জানিয়েছেন, ভবনের বর্তমান অবস্থা যাচাইয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি শিগগিরই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে। একই সঙ্গে জাদুঘরটি এবং দেশের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তির সংরক্ষণে একটি প্রকল্প প্রস্তাবও সরকারের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
