ঢাকা, শুক্রবার ০৫, জুন ২০২৬ ১৬:০৭:৪৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

খেলাপি ঋণ অর্থনীতিকে প্রচণ্ড চাপে ফেলছে: ড. ফাহমিদা

অনলাইন ডেস্ক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৪২ পিএম, ৫ জুন ২০২৬ শুক্রবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থা, ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং বহিঃখাতের চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে জটিল এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। 

বৃহস্পতিবার ধানমন্ডিতে সিপিডি আয়োজিত ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ বিষয়ক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংক খাতে ঋণের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে কমেছে অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও-এডিআর। বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও বিনিয়োগ পরিবেশের অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। 

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে ঋণের সুদের হার বেড়েছে, যা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগকে আরো নিরুৎসাহিত করছে।

ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ব্যাংকগুলোর সম্পদের প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ে গৃহীত রিভিউ কার্যক্রম ইতিবাচক উদ্যোগ। ইতোমধ্যে ছয়টি ব্যাংকের পর্যালোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং আরো ১১টি ব্যাংকের রিভিউ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে প্রকৃত আর্থিক চিত্র প্রকাশিত হলে ব্যাংক মালিকদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

তিনি ব্যাংক একীভূতকরণ বা মার্জার প্রক্রিয়ার জটিলতা তুলে ধরে ব্যাংক কোম্পানি আইন-২০২৫ দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি ব্যাংক রেজ্যুলেশন অর্ডিন্যান্স এবং দেউলিয়া আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

খেলাপি ঋণ বিষয়ে সিপিডির গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে ড. ফাহমিদা বলেন, বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ১০ বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়া এবং ডাউনপেমেন্টের শর্ত শিথিল করার ফলে আর্থিক খাতে নৈতিক ঝুঁকি (মোরাল হ্যাজার্ড) সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া বৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের জন্য ঋণের সীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করায় ঋণ কেন্দ্রীভবন ও খেলাপির ঝুঁকি বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। 

তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকিং খাতকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং টাকার অবমূল্যায়ন ঘটে। যদিও অবমূল্যায়ন রফতানির জন্য কিছুটা সহায়ক, তবে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে দেয়।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সুশাসন নিশ্চিত না করে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠাই এ সংকট উত্তরণের অন্যতম পূর্বশর্ত।

প্রবন্ধে ব্যাংক খাত সংস্কারের বিষয়ে সিপিডি বলছে, ১৭টি ব্যাংকের সম্পদমান পর্যালোচনা (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ) শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংকের পর্যালোচনায় প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি খেলাপি ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে প্রকাশিত তথ্যের বড় ধরনের পার্থক্যের ইঙ্গিত মিলেছে। এ অবস্থায় সিপিডি কঠোর ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতি বাস্তবায়ন, নিয়ন্ত্রক শিথিলতা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার, পুনঃতফসিলের সুযোগ সীমিত করা এবং পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠিত ঋণসহ প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও তদারকি সক্ষমতা আরো জোরদার করতে হবে।

সিপিডির প্রবন্ধে রাজস্ব সম্পর্কে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য অপারেশনালি অবাস্তব হয়ে পড়েছে। জুলাই-মার্চ সময়ে রাজস্ব আদায় বেড়েছে মাত্র ৬.৯ শতাংশ। এখন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শেষ প্রান্তিকে ৮৪.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বাস্তবে অর্জন করা কঠিন। এনবিআরের কর আদায়ে কিছু উন্নতি হলেও জুলাই-এপ্রিল সময়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ চার হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। একই সঙ্গে আইএমএফের রাজস্ব সংগ্রহ সংক্রান্ত শর্ত পূরণ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। সিপিডির প্রতিবেদনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে দীর্ঘমেয়াদি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা উল্লেখ করে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশ, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৫৭ শতাংশ। জ্বালানি, পরিবহন ও সেবা খাতের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। মজুরি বৃদ্ধির হার ৮.১৬ শতাংশ হলেও মূল্যস্ফীতি তার চেয়ে বেশি থাকায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।