প্রসঙ্গ হামের টিকা: থামছে না শিশুমৃত্যুর মিছিল
ডা, আসিফ চৌধুরী
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০২:২৯ পিএম, ৬ জুন ২০২৬ শনিবার
প্রতীকী ছবি।
হাম একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ সংক্রামক রোগগুলোর একটি ছিল। টিকার আবিষ্কার ও ব্যাপক প্রয়োগের ফলে বহু দেশ এই রোগকে প্রায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের নানা প্রান্তে আবারও হামের প্রকোপ বাড়ছে। এর সবচেয়ে করুণ দিক হলো—এখনো অসংখ্য শিশু এমন একটি রোগে প্রাণ হারাচ্ছে, যার বিরুদ্ধে কার্যকর ও নিরাপদ টিকা বহু বছর ধরেই বিদ্যমান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, টিকাদান কর্মসূচিতে সামান্য শৈথিল্য দেখা দিলেই হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কারণ হামের ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক। আক্রান্ত একজন ব্যক্তি তার আশপাশের প্রায় সবাইকে সংক্রমিত করতে পারে, যদি তারা টিকা না নিয়ে থাকে। ফলে একটি ছোট গাফিলতি মুহূর্তেই বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়।
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। এর ফলে শিশু মৃত্যুর হার কমেছে এবং হামসহ বিভিন্ন প্রতিরোধযোগ্য রোগ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু জনসংখ্যার বিশালতা, শহরমুখী অভিবাসন, দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং কিছু ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে এখনো শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এ বাস্তবতা উদ্বেগজনক।
হামের ভয়াবহতা শুধু মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই রোগে আক্রান্ত শিশুরা নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ নানা জটিলতায় ভুগতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিও থেকে যায়। অথচ সময়মতো দুই ডোজ টিকা গ্রহণ করলে এসব ঝুঁকি প্রায় পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকা নিয়ে বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের কারণে হামের প্রকোপ বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুল তথ্য অনেক অভিভাবককে দ্বিধায় ফেলছে। বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সুস্পষ্ট প্রমাণ উপেক্ষা করে যখন টিকা সম্পর্কে ভয় তৈরি করা হয়, তখন তার সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় শিশুরা। তাই টিকা নিয়ে গুজব ও ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, চিকিৎসক এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত অবস্থান জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো ভাসমান জনগোষ্ঠী, বস্তিবাসী ও সীমান্তবর্তী এলাকার শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনা। জাতীয় গড় যতই আশাব্যঞ্জক হোক, কোনো একটি এলাকায় টিকাগ্রহণের হার কমে গেলে সেখান থেকেই সংক্রমণের নতুন কেন্দ্র তৈরি হতে পারে। তাই শুধু পরিসংখ্যানগত সাফল্যে সন্তুষ্ট না থেকে প্রতিটি শিশুর কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে।
শিশুমৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি, আর রাষ্ট্রের জন্যও এক ধরনের ব্যর্থতার প্রতীক। বিশেষ করে যখন সেই মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে কোনো শিশুর মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। প্রয়োজন আরও জোরালো টিকাদান কর্মসূচি, নিয়মিত নজরদারি, গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ।
মনে রাখতে হবে, একটি টিকা শুধু একটি শিশুকেই সুরক্ষা দেয় না; এটি পুরো সমাজকে নিরাপদ রাখে। হামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের অবহেলা বা উদাসীনতার কোনো সুযোগ নেই। শিশুমৃত্যুর এই মিছিল থামাতে হলে টিকার প্রতি আস্থা ও সবার জন্য টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করাই হতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
