ঢাকা, শুক্রবার ১২, জুন ২০২৬ ২৩:১১:০১ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

শাকিরা: বিশ্বকাপের ‘গানকন্যা’র উত্থান, রেকর্ড ও বিশ্বজয়ের গল্প

বিনোদন ডেস্ক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৬:৩৪ পিএম, ১২ জুন ২০২৬ শুক্রবার

শাকিরা

শাকিরা

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে অনেক শিল্পীই অফিসিয়াল গান গেয়েছেন। কিন্তু একজন শিল্পী আছেন, যার নাম শুনলেই কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মনে ভেসে ওঠে বিশ্বকাপের রঙ, উন্মাদনা আর উৎসবের স্মৃতি। তিনি শাকিরা। কলম্বিয়ার এই পপ তারকা শুধু সংগীতশিল্পী নন, বিশ্বকাপ ফুটবলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশও বটে।

২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী আয়োজনে আবারও মঞ্চ মাতিয়েছেন শাকিরা। বার্না বয়ের সঙ্গে গাওয়া ‘ডাই ডাই’ গান দিয়ে তিনি বিশ্বকাপে নিজের চতুর্থ অধ্যায় শুরু করেছেন। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের চারটি ভিন্ন আসরের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ইতিহাসের প্রথম শিল্পীও হয়ে গেছেন তিনি।

জন্ম থেকেই অন্যরকম: পুরো নাম শাকিরা ইসাবেল মেবারাক রিপোল। ১৯৭৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কলম্বিয়ার উপকূলীয় শহর ব্যারানকিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। লেবানিজ বংশোদ্ভূত বাবা ও কলম্বিয়ান মায়ের সন্তান শাকিরা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ব্যতিক্রমী প্রতিভার অধিকারী। মাত্র ১০ বছর বয়সেই গান লেখা শুরু করেন। শিশুকালেই নাচ, কবিতা ও সংগীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ তৈরি হয় তাঁর।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ করেন। তবে প্রকৃত সাফল্য আসে ১৯৯৫ সালে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

কীভাবে বিশ্ব তারকা হলেন: ২০০১ সালে তাঁর ইংরেজি অ্যালবাম Laundry Service প্রকাশের পর বিশ্বসংগীতে এক নতুন ঝড় ওঠে। "Whenever, Wherever" গানটি রাতারাতি তাঁকে আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত করে। এরপর "Hips Don't Lie", "She Wolf", "Waka Waka", "Loca", "Chantaje", "TQG"—একটির পর একটি বিশ্বজয়ী গান উপহার দিয়েছেন তিনি।

সংগীতবিশারদদের মতে, লাতিন, আরবি, রক, পপ ও লোকসংগীতের অনন্য মিশ্রণই শাকিরাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

রেকর্ডের পর রেকর্ড: শাকিরাকে বলা হয় "লাতিন মিউজিকের রানি"। তিনি সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত কলম্বিয়ান শিল্পী। বিশ্বজুড়ে তাঁর অ্যালবাম ও গানের বিক্রি ৯৫ মিলিয়নেরও বেশি। বিভিন্ন সূত্রে এ সংখ্যা ১২৫ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর ঝুলিতে রয়েছে—

একাধিক গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড
অসংখ্য লাতিন গ্র্যামি
বিলবোর্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ড
এমটিভি ভিডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ড
হলিউড ওয়াক অব ফেমে তারকা
২০২৩ সালে এমটিভি মাইকেল জ্যাকসন ভিডিও ভ্যানগার্ড অ্যাওয়ার্ড

বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী শিল্পীদের একজন হিসেবে বিবেচিত হন।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক: ফুটবল আর শাকিরার সম্পর্ক প্রায় দুই দশকের। ২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানে "Hips Don't Lie" পরিবেশন করেন তিনি।

২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের অফিসিয়াল গান "Waka Waka (This Time for Africa)" গেয়ে বিশ্বকাপ সংগীতের ইতিহাসই বদলে দেন। গানটি শুধু জনপ্রিয় হয়নি, পরবর্তীতে স্পটিফাইয়ে সবচেয়ে বেশি স্ট্রিম হওয়া বিশ্বকাপ সংগীতের গিনেস বিশ্বরেকর্ডও গড়ে।

২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে "La La La (Brazil 2014)" গান দিয়ে আবারও আলোচনায় আসেন।

এরপর ২০২৬ সালে "Dai Dai" গান নিয়ে ফিরেছেন বিশ্বকাপের মঞ্চে। অর্থাৎ ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ এবং ২০২৬—চারটি বিশ্বকাপের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন তিনি।

শাকিরা কী বলছেন: বিশ্বকাপের নতুন গান প্রকাশের সময় শাকিরা বলেন, এই গান ফুটবলের আবেগ, ঐক্য এবং বিশ্বের মানুষের মিলনের প্রতীক।

ফিফার বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, সংগীত মানুষের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব কমিয়ে দেয়। আর বিশ্বকাপ এমন একটি মঞ্চ, যেখানে পুরো পৃথিবী এক পরিবারে পরিণত হয়।

মাতৃত্ব নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন—

"মা হওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।"

এই বক্তব্যই তুলে ধরে, বিশ্বখ্যাত তারকা হওয়ার পরও তিনি নিজেকে একজন সাধারণ মা হিসেবেই দেখেন।

ভক্তদের চোখে শাকিরা: বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের কাছে শাকিরা কেবল একজন গায়িকা নন, তিনি একটি অনুভূতির নাম।

একজন ভক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন— "Whenever, Wherever গানটি আমাকে প্রথম শাকিরার ভক্ত বানিয়েছিল। এখনও আমি নিয়মিত শুনি।"

আরেকজন লিখেছেন—"Waka Waka আমার প্রিয় বিশ্বকাপ সংগীত। অসাধারণ আকর্ষণীয় একটি গান।"

২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন গান নিয়েও উচ্ছ্বসিত ভক্তরা। একজন লিখেছেন—"Shakira's back... chills."

সমাজসেবায়ও উজ্জ্বল: সংগীতের বাইরেও শাকিরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও শিশু উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত Pies Descalzos Foundation কলম্বিয়ার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাঁর জন্মশহর ব্যারানকিয়ায় তাঁর সম্মানে বিশাল ভাস্কর্যও নির্মাণ করা হয়েছে।

কেন তিনি আলাদা: পৃথিবীতে অসংখ্য গায়ক-গায়িকা এসেছেন, এসেছেন বিশ্বকাপের অনেক সংগীতও। কিন্তু খুব কম শিল্পীই আছেন, যাদের নাম শুনলেই একটি বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরের কথা মনে পড়ে।

শাকিরা সেই বিরলদের একজন।

তাঁর গান শুধু চার্টের শীর্ষে ওঠেনি, ফুটবলপ্রেমীদের আবেগের অংশ হয়ে গেছে। "ওয়াকা ওয়াকা" বাজলেই এখনও বিশ্বকাপের স্মৃতি ফিরে আসে কোটি মানুষের মনে। আর সে কারণেই সংগীতের ইতিহাসে তিনি শুধু একজন তারকা নন—তিনি বিশ্বকাপ ফুটবলের চিরন্তন ‘গানকন্যা’।