শিশুশ্রম নির্মূলে বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ চাইলেন বক্তারা
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৯:২৭ পিএম, ১৩ জুন ২০২৬ শনিবার
ছবি: সংগ্রহিত।
দেশে এখনো প্রায় ১১ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। নির্মাণশ্রমিক, ওয়ার্কশপ কর্মী, পরিবহন সহকারী, কৃষিশ্রমিক, গৃহকর্মী কিংবা বর্জ্য সংগ্রাহক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত জীবন ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে তারা। এ অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নির্মূলে জাতীয় বাজেটে পৃথক ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতা, শিশু অধিকারকর্মী ও উন্নয়ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
আজ শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নির্মূলে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, শিশুশ্রম কেবল শ্রম খাতের সমস্যা নয়; এটি শিশু অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই শিশুশ্রম বন্ধে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন।
অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ইয়ং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট, রাইটস অ্যান্ড ক্লাইমেট (ওয়াইডব্লিউডিআরসি) এবং নারী উন্নয়ন শক্তি (এনইউএস)। এতে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম, টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন, ডোমেস্টিক ওয়ার্কার এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ এবং ফোরাম ফর কালচার অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট।
সভায় উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ-২০২২ অনুযায়ী দেশে প্রায় ৩৫ লাখ ৪০ হাজার শিশু কোনো না কোনো শ্রমে নিয়োজিত। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত রয়েছে। এসব শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগও হারাচ্ছে তারা।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়াইডব্লিউডিআরসির নির্বাহী চেয়ারপারসন নুসরাত সুলতানা আফরোজ। তিনি বলেন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষার সীমিত সুযোগ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে শিশুশ্রমের হার বাড়ছে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার পরিবারগুলো জীবিকার তাগিদে শিশুদের কাজে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে।
তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নির্মূলে পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় শিশুশ্রম বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি সফলতা অর্জন সম্ভব হবে না।
সভায় সভাপতিত্ব করেন নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী পরিচালক ড. আফরোজা পারভীন। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের উদ্ধার, পুনর্বাসন, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুশ্রম প্রতিরোধে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শ্রমিক নেতা আব্দুল হোসেন বলেন, শ্রমজীবী পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে শিশুশ্রম নির্মূল করা কঠিন। তিনি দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথিরা বলেন, দেশের বিভিন্ন খাতে গোপনে ও প্রকাশ্যে শিশুশ্রম চলছে। বিশেষ করে গৃহকর্ম, নির্মাণ, পরিবহন ও অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম পর্যবেক্ষণ এবং আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করতে হবে।
সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হাসি আক্তার বলেন, অনেক পরিবার চরম দারিদ্র্যের কারণে সন্তানদের কাজে পাঠাতে বাধ্য হয়। পরিবারগুলোর জন্য আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি করা গেলে শিশুশ্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
সভা থেকে জাতীয় বাজেটে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নির্মূলে পৃথক বরাদ্দ নিশ্চিত করা, শিশুদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন, দরিদ্র পরিবারের জন্য নগদ ও খাদ্য সহায়তা বৃদ্ধি, শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে উপবৃত্তি সম্প্রসারণ, কিশোর-কিশোরীদের জন্য বাজার উপযোগী কারিগরি প্রশিক্ষণ চালু এবং শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিবাসনপ্রবণ এলাকার শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ, জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, শ্রমিক সংগঠন ও শিশু অধিকার সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান বক্তারা।
বক্তারা সতর্ক করে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নির্মূল করা না গেলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন ব্যাহত হবে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এখনই শিশুশ্রম প্রতিরোধ, শিক্ষা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অন্যথায় এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতির ওপর পড়বে।
