ঢাকা, সোমবার ১৫, জুন ২০২৬ ৪:২৪:১১ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

প্রথম বৃষ্টির প্রেমপত্র: আজ পহেলা আষাঢ়

অনু সরকার

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:২২ এএম, ১৫ জুন ২০২৬ সোমবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ, দূরের আকাশে কালো মেঘের ভেলা, কদমফুলের সুবাস আর জানালার কাঁচে টুপটাপ বৃষ্টির ছোঁয়া—এসব নিয়েই আজ শুরু হলো বাঙালির সবচেয়ে আবেগঘন ও রোমান্টিক ঋতু বর্ষা। আজ পহেলা আষাঢ়, বাংলা ১৪৩৩ সনের আষাঢ় মাসের প্রথম দিন। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলার প্রকৃতিতে প্রবেশ করল বর্ষাকাল।

প্রখর রোদ, দাবদাহ আর ধুলিধূসর গ্রীষ্মের দীর্ঘ ক্লান্তির পর আষাঢ় যেন প্রকৃতির হাতে লেখা এক প্রেমপত্র। সেই প্রেমপত্রের প্রতিটি শব্দে আছে বৃষ্টির সুর, মেঘের রং আর সবুজের অনন্ত মায়া। বছরের অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্ষার আগমনকে ঘিরে বাঙালির আবেগ যেন একটু বেশিই গভীর, একটু বেশিই রোমান্টিক।

বাংলার প্রকৃতিতে বর্ষা মানেই নতুন প্রাণের সঞ্চার। খাল-বিল, নদী-নালা, মাঠ-ঘাট, বন-বনানী সব যেন নতুন করে সেজে ওঠে। শুকিয়ে যাওয়া মাটি ফিরে পায় সজীবতা। কৃষকের মুখে ফোটে আশার হাসি। আকাশের বুকজুড়ে ছুটে চলা মেঘ আর অবিরাম বৃষ্টিধারা যেন প্রকৃতিকে ধুয়ে-মুছে নতুন রূপে সাজিয়ে তোলে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত ‘আষাঢ়’ কবিতায় বর্ষার সেই মুগ্ধতা তুলে ধরেছিলেন—

"বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর,
আউশের ক্ষেত জলে ভরভর..."

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজুড়ে বর্ষা বারবার ফিরে এসেছে প্রেম, বিরহ ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে। তাঁর অমর গান ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ আজও প্রেমিক-প্রেমিকাদের হৃদয়ে বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করে।

বাংলা সনের তৃতীয় মাস আষাঢ়। সাধারণত জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই মাসের বিস্তৃতি। জ্যোতির্বিদদের মতে, পূর্বাষাঢ়া ও উত্তরাষাঢ়া নক্ষত্রের নাম থেকেই ‘আষাঢ়’ শব্দটির উৎপত্তি।

তবে বাঙালির কাছে আষাঢ় কেবল একটি মাস নয়, এটি এক অনুভূতির নাম। এটি প্রেমের, অপেক্ষার, স্মৃতির এবং মুগ্ধতার ঋতু। বৃষ্টিভেজা বিকেলে জানালার পাশে বসে থাকা, কাদামাখা গ্রামবাংলার পথ, টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ কিংবা নদীর বুকে বৃষ্টির নাচ—সবকিছুই যেন মানুষের মনকে অন্যরকম আবেগে ভরিয়ে তোলে।

প্রাচীন ভারতীয় কবি কালিদাস তাঁর বিখ্যাত কাব্য মেঘদূত-এ মেঘকে দূত বানিয়ে প্রেম ও বিরহের বার্তা পাঠিয়েছিলেন। আষাঢ়ের প্রথম দিনের মেঘ দেখেই তাঁর কাব্যের সূচনা। সেই ধারাবাহিকতায় শত শত বছর ধরে বর্ষা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির পদাবলীতেও বর্ষা এসেছে বিরহের প্রতীক হয়ে। তাঁর বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি—“এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর”—আজও বৃষ্টিভেজা দিনে মানুষের হৃদয়ে নাড়া দেয়।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বর্ষাকে দেখেছিলেন এক অপার্থিব রূপে। তাঁর কাছে বর্ষা ছিল ‘বাদলের পরী’। তিনি লিখেছিলেন—

"রিমঝিম রিমঝিম ঘন দেয়া বরষে,
কাজরি নাচিয়া চল পুরনারী হরষে..."

সংস্কৃতিবিদদের মতে, পৃথিবীর খুব কম জাতির সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বর্ষা এত গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে, যতটা করেছে বাঙালির জীবনে। প্রেম, বিরহ, পূজা, কৃষি, উৎসব—সবকিছুর সঙ্গে মিশে আছে বর্ষার স্নিগ্ধ উপস্থিতি।

এদিকে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, চলতি মৌসুমে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে কৃষিকাজের জন্যও বর্ষার শুরুটা ইতিবাচক বলে মনে করছেন তারা।

পহেলা আষাঢ়ের এই দিনে তাই প্রকৃতির পাশাপাশি ভিজে উঠছে মানুষের মনও। মেঘলা আকাশ, কদমফুল আর বৃষ্টির সুরে নতুন করে জেগে উঠেছে বাংলার চিরচেনা রূপ। যেন প্রকৃতি নিজেই বলছে—গ্রীষ্মের সব ক্লান্তি ভুলে এবার ভালোবাসার ঋতুতে স্বাগতম।