ডেঙ্গুর বিস্তার, উদ্বেগ ও প্রতিরোধে চ্যালেঞ্জ
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৩:৪৩ পিএম, ২৩ জুন ২০২৬ মঙ্গলবার
প্রতীকী ছবি।
বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই দেশে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ডেঙ্গু। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। হাসপাতালগুলোতে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও প্লাটিলেট কমে যাওয়ার উপসর্গ নিয়ে রোগীদের ভিড় বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকাতেও আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
কেন বাড়ছে ডেঙ্গু?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা এবং নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এডিস মশার বংশবিস্তার বেড়েছে। বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব, এসির ট্রে এবং জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে।
কীটতত্ত্ববিদদের ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ছে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
সরকারের উদ্যোগ
ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোকে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা বেড ও ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট, স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম চালানোর দাবি করেছে। বিভিন্ন এলাকায় লার্ভা ধ্বংস ও ফগিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
সিটি করপোরেশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। কিন্তু রাজধানীর বহু এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, খোলা ড্রেন এবং জমে থাকা পানির কারণে মশা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণকে মৌসুমি কর্মসূচি না ভেবে বছরব্যাপী কার্যক্রম হিসেবে পরিচালনা করতে হবে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ
চিকিৎসকরা বলছেন, জ্বর হলেই আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে পর্যাপ্ত পানি, খাবার স্যালাইন ও তরল খাবার গ্রহণ জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
প্রতিরোধেই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্যোগ সমান গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহে অন্তত একদিন বাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে। মশারি ব্যবহার, ফুলহাতা পোশাক পরা এবং মশা নিরোধক ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। নাগরিক সচেতনতা, স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয়তা এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তুতির সমন্বয়েই ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বর্ষার এই সময়ে সামান্য অসতর্কতাও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এখনই সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
