গাজায় ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে এতিম কিশোরী দানার স্বপ্নযাত্রা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৭:৩৭ পিএম, ২৭ জুন ২০২৬ শনিবার
ফিলিস্তিনি কিশোরী দানা শাবাত।
চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন, মাথার ওপর শুধু একটি ত্রাণের তাঁবু। নেই স্কুল, নেই পড়ার ঘর, নেই বিদ্যুতের আলো। তবুও স্বপ্ন থেমে থাকেনি। রাতের অন্ধকারে একটি টর্চলাইটের ক্ষীণ আলোয় বই খুলে বসে ১৮ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি কিশোরী দানা শাবাত। যুদ্ধের বিভীষিকার মাঝেও সে লড়ছে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য।
গাজার চলমান সংকটের মধ্যেই শুরু হয়েছে দেশটির উচ্চ মাধ্যমিক সমাপনী পরীক্ষা ‘তাওজিহি’। প্রতিদিন প্রায় এক ঘণ্টা হেঁটে একটি ইন্টারনেট ক্যাফেতে গিয়ে অনলাইনে পরীক্ষা দিচ্ছে দানা। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন শুধু পরীক্ষার হলের দিকে নয়, বরং নিজের স্বপ্নের দিকেও এগিয়ে যাওয়া।
যুদ্ধের আগে দানা ছিল একজন অসাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থী। তার ফলাফল কখনোই ৯৯ শতাংশের নিচে নামেনি। কিন্তু গত বছরের এক ইসরায়েলি হামলায় তার জীবনের সবকিছু বদলে যায়। সেই হামলায় নিহত হন তার মা লিনা। ছোট বোন আলমা হারায় একটি চোখ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় তাদের সাজানো সংসার। এখন মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহর একটি অস্থায়ী তাঁবুতেই বাবা ও বোনকে নিয়ে দিন কাটছে তার।
দানার বাবা মুহান্না শাবাত, যিনি একসময় রসায়নের শিক্ষক ছিলেন, বলেন, মেয়েদের লেখাপড়াই ছিল তাদের মায়ের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। সংসারের কাজ নয়, পড়াশোনাতেই যেন তারা মন দেয়—এটাই ছিল তার চাওয়া। আজ সেই মা নেই, কিন্তু তার স্বপ্নই দানাকে প্রতিদিন নতুন করে শক্তি জোগায়।
গাজার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এবার অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। একটি সচল ইন্টারনেট সংযোগই এখন শিক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসা। পরীক্ষা শেষে স্বস্তির হাসি নিয়ে দানা বাবাকে জানায়, পরীক্ষা ভালো হয়েছে। তবে যুদ্ধের বাস্তবতা তাকে বিশ্রামের সুযোগও দেয় না। তাঁবুতে বিদ্যুৎ না থাকায় নিজের ও বাবার মোবাইল ফোন চার্জ দিতে দূরের চার্জিং স্টেশনে পাঠাতে হয়, কারণ পরের পরীক্ষার প্রস্তুতিও থামিয়ে রাখা যাবে না।
জীবনের এত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও দানা স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়নি। বড় হয়ে সে একজন কমিউনিটি লিডার হতে চায়, শিখতে চায় বিভিন্ন ভাষা। তবে তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—একদিন নিরাপদ জীবনে ফিরে মায়ের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করা।
দানার কণ্ঠে তাই আজও আশার সুর, “একদিন এই তাঁবুর জীবন শেষ হবে। আমি সফল হব, যেমনটা আমার মা সবসময় চেয়েছিলেন।”
গাজার ধ্বংসস্তূপের ভেতর দাঁড়িয়ে দানার এই সংগ্রাম যেন শুধু একজন কিশোরীর গল্প নয়; এটি যুদ্ধের মাঝেও স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার, হার না মানা মানবিক সাহসের এক অনন্য প্রতীক।
