বর্ষার শুরুতেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে উদ্যোগ জরুরি
জোসেফ সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০১:১৭ পিএম, ৩ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার
প্রতীকী ছবি।
বর্ষার শুরুতেই আবারও ডেঙ্গুর অশনিসংকেত দেখা দিয়েছে। জুন মাসে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখনই সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে জুলাই-আগস্টে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৬৭ জনে। এ সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন। শুধু জুন মাসেই শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৯০৭ জন, যা মে মাসের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারী বৃষ্টিপাত, উচ্চ তাপমাত্রা, আর্দ্র আবহাওয়া এবং অনেক এলাকায় অপর্যাপ্ত মশকনিধন কার্যক্রম এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। তাই রোগী বেড়ে যাওয়ার অপেক্ষা না করে এখনই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা মো. আবদুল কাদের বলেন, “বিকেলের পর বাসায় বসে থাকাই কঠিন হয়ে যায়। কয়েল, স্প্রে—সবই ব্যবহার করছি। কিন্তু আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার না করলে তো মশা কমবে না।”
মগবাজারের গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, “শিশুদের নিয়ে সব সময় ভয় কাজ করে। আমরা নিজেদের বাসা পরিষ্কার রাখলেও পাশের নির্মাণাধীন ভবনে সপ্তাহের পর সপ্তাহ পানি জমে থাকে। সেসব দেখার কেউ নেই।”
মোহাম্মদপুরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, “শুধু মশার ওষুধ ছিটালেই হবে না। কোথায় লার্ভা জন্মাচ্ছে, সেগুলো ধ্বংস করতে হবে। এলাকাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান নিয়মিত হওয়া দরকার।”
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সচেতনতা। জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, শরীর ও গিঁটে ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি বা শরীরে লালচে দাগ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। নিজের ইচ্ছামতো ব্যথানাশক ওষুধ সেবন বিপজ্জনক হতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, “জুলাই মাসে ঢাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অন্তত দ্বিগুণ হতে পারে। রাজধানীর বাইরের জেলাগুলোতেও সংক্রমণ দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আগাম সতর্কতা ও হটস্পট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিয়মিত ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি মানুষকে বাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশে কোথাও তিন দিনের বেশি পরিষ্কার পানি জমতে না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, “নিয়মিত লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড ছিটানো হচ্ছে। বিভিন্ন ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা অভিযানও চলছে। তবে নাগরিকদের সহযোগিতা ছাড়া শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।”
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, “নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, টব, পরিত্যক্ত টায়ার এবং বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি অপসারণে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোথাও এডিস মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
পরিবেশবিদদের মতে, ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব রোগটির বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে এটি এখন একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছড়ালেই হবে না। প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত লার্ভা জরিপ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, স্কুল-কলেজভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি, নির্মাণাধীন ভবনের তদারকি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত একদিন বাড়ির ছাদ, বারান্দা, টব, এসির ট্রে, ড্রাম, বালতি ও অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে।
ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। কিন্তু অবহেলা, সমন্বয়হীনতা এবং অসচেতনতার কারণে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, অনেকের প্রাণও ঝরে যাচ্ছে। তাই সময় থাকতে সরকার, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ করতে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে সামনের সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।
