২০ জেলায় বন্যার বিস্তার, উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে বাড়ছে দুর্ভোগ
অনলাইন ডেস্ক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১১:০৬ এএম, ১০ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার
ছবি: সংগ্রহিত।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। ইতোমধ্যে অন্তত ২০টি জেলায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও বসতবাড়ি, কোথাও কৃষিজমি আবার কোথাও যোগাযোগ ব্যবস্থা পানিতে তলিয়ে গিয়ে লাখো মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙন নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা। উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও ময়মনসিংহের নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলেও পানি ঢুকে পড়েছে। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রামের অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কুমিল্লার গোমতী নদীর পানিও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যার ফলে চরাঞ্চলের শত শত একর কৃষিজমি পানির নিচে চলে গেছে।
কক্সবাজারে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও সাগরের জোয়ারের কারণে নদীর পানি নামতে না পারায় জেলার ছয়টি উপজেলার প্রায় ৪০টি ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক গ্রামে ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে, গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সংকটের পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঘটনাও উদ্বেগজনক। রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে একাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
সিলেট অঞ্চলেও কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এখনো বেশির ভাগ নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রশাসন সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় শত শত আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ টিলা এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকতে বলেছে।
অন্যদিকে যমুনা ও তিস্তা অববাহিকায় নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক। বহু পরিবার নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। কৃষকরাও বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ফসল চোখের সামনে পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে হতাশ হয়ে পড়েছেন।
এদিকে টানা বর্ষণে খুলনা, লক্ষ্মীপুর, মাদারীপুরসহ আরও কয়েকটি জেলায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। শহর ও গ্রামে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় সবজি ক্ষেত, আমনের বীজতলা, মাছের ঘের ও চিংড়ি খামারের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে সরকার জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় ৬৪ জেলায় চাল ও নগদ অর্থসহ ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ত্রাণ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তারা নদী ব্যবস্থাপনার আধুনিক পরিকল্পনা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজের মতো বড় প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের মতে, অতিরিক্ত বন্যার পানি সংরক্ষণ, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ নিশ্চিত করতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
আবহাওয়াবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে দেশের বিভিন্ন নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি বন্যা ও নদীভাঙনের পরিস্থিতিও আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
