টানা বৃষ্টিতে তছনছ কৃষি-অর্থনীতি
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১২:১৭ পিএম, ২৩ জুলাই ২০২৬ বৃহস্পতিবার
সংগৃহীত ছবি
কয়েকদিন ধরে বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে বিরামহীন বৃষ্টি হচ্ছে। কখনো ভারী, কখনো হালকা। বৃষ্টি তছনছ করে দিয়েছে এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি। ডুবেছে শত শত একর ফসলি জমি, ভেসে গেছে মাছ। হতাহতও হয়েছেন প্রায় অর্ধশত কৃষক। কৃষি এবং মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক জরিপ বলছে, বিভাগের ছয় জেলায় এ দুই সেক্টরে এখন পর্যন্ত মোট ক্ষতির পরিমাণ ৩৮ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। যার মধ্যে শুধু কৃষিপণ্যের ক্ষতি প্রায় ১৮ কোটি টাকার। আরও ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে মৎস্য খাতে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামের আব্দুর রহিম বলেন, ‘মাছচাষিদের স্বপ্ন পানিতে ভেসে গেছে।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অবিরাম বর্ষণে বিভাগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নদীতীরবর্তী এবং নিম্নাঞ্চল। এতে পাকা ধান, শাকসবজি, রোপা আমন বীজতলা এবং উদ্যান ফসল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক এলাকার নিচু জমিতে পানি জমে যাওয়ায় সদ্য রোপণ করা চারা পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। মাঠের পর মাঠ সবজিক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাজারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল খামারবাড়ির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ৯ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিপাত ও নদনদীর পানি বৃদ্ধিতে বরিশাল বিভাগের পাঁচ জেলায় ৪১ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৯ হাজার ৯১৯ মেট্রিক টন ফসল নষ্ট হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ফসলের ক্ষতি হয়েছে বরগুনা জেলায়। যেখানে ৬ হাজার ৭০৯ হেক্টর জমির ফসল পানিতে ডুবে আছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি পিরোজপুরে, কারণ এ জেলায় ছোট খামারের সংখ্যা বেশি, যেগুলো ভেসে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, পিরোজপুরে ২৫ হাজার ৮০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে কম বরগুনায় ১ হাজার ১২৫ কৃষকের ক্ষতি হয়েছে।
অন্যদিকে, বরিশাল মৎস্য ভবনের তথ্য বলছে, কৃষির পাশাপাশি মৎস্য খাতেও ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। বরিশাল ও ঝালকাঠি বাদে বিভাগের বাকি ছয় জেলায় মৎস্য খাতে এখন পর্যন্ত ২০ কোটি ৩০ লাখ ২৪ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করেছে মৎস্য বিভাগ। এর মধ্যে ১৪৪টি ইউনিয়নে ৬ হাজার ৪৬৯ মাছের পুকুর ও খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৪৫৫ হেক্টর পুকুর, ঘের ও অন্যান্য জলাশয় প্লাবিত হয়ে ৭৪৭ টন মাছ এবং ৯৩ লাখ মাছের পোনা, ৪৫ মেট্রিক টন চিংড়ি ভেসে গেছে। বরিশাল আঞ্চলিক মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব পুকুর ও ঘেরে চাষকৃত রুই, কাতল, মৃগেল, মাগুর, কইসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বৃষ্টি এবং জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে। অনেক চাষি বৃষ্টির মধ্যে ঘেরের চারপাশে নেট দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বৃষ্টির পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, অনেকেই নেট দিয়েও রক্ষা করতে পারেননি।
মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, মৎস্য খাতে ক্ষতির পাশাপাশি বিভাগে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন জেলে। আহত হয়েছেন ২৫ জন। তারা সবাই পটুয়াখালীর বাসিন্দা। তারা সবাই দুর্যোগকালীন নদী এবং সমুদ্রে মাছ শিকার করতে গিয়ে হতাহত হয়েছেন।
বর্ষা মৌসুমের শুরুতে এমন ক্ষতির কারণে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের কৃষক এবং কৃষি উদ্যোক্তারা। অনেকের স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে রূপ নিয়েছে। এখন লাভের পরিবর্তে দেনা কীভাবে শোধ করবেন, তা নিয়ে ভাবছেন দরিদ্র কৃষক আর উদ্যোক্তারা। বরিশাল সদর উপজেলার চাঁদপুরা ইউনিয়নের কৃষক রিয়াজ বলেন, ‘ধান কাটার সময়ের আগেই ক্ষেত ডুবে গেছে। এখন আধাপাকা ধান কাটতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন এবং চালের মান খারাপ হবে।’
ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা ও সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছেন বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতির কাজ চলছে। অন্যদিকে, মৎস্য খাতে ক্ষতিগ্রস্ত চাষি, উদ্যোক্তা এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তালিকা এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
