ঢাকা, মঙ্গলবার ২৮, জুলাই ২০২৬ ১৪:১৮:০৬ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

হেপাটাইটিস ‘সি’ সংক্রমণে বিশ্বের শীর্ষ দশে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৩৭ এএম, ২৮ জুলাই ২০২৬ মঙ্গলবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

দীর্ঘস্থায়ী ভাইরাল হেপাটাইটিস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ। প্রতি বছর এ রোগে আনুমানিক ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বেশিরভাগ মৃত্যুই ঘটে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের কারণে। ভাইরাল হেপাটাইটিসজনিত মোট মৃত্যুর প্রায় ৯৫ শতাংশের জন্য দায়ী হেপাটাইটিস ‘বি’ ও হেপাটাইটিস ‘সি’। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার মানুষ নতুন করে এ দুই ভাইরাসে আক্রান্ত হন এবং প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বর্তমানে আনুমানিক ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ভাইরাল হেপাটাইটিস নিয়ে জীবনযাপন করছেন। ২০২৪ সালে এ অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার নতুন হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ সংক্রমণ এবং প্রায় ২ লাখ হেপাটাইটিস সম্পর্কিত মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়।

বাংলাদেশের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস ‘সি’ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ দেশের অন্যতম। সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সক্রিয় হেপাটাইটিস ‘সি’ সংক্রমণের হার প্রায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হলেও উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী, ইনজেকশন গ্রহণকারী মাদকাসক্ত ব্যক্তি, রক্ত গ্রহণে নির্ভরশীল রোগী এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে এর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বেশি।

একই সঙ্গে হেপাটাইটিস ‘বি’-এর সংক্রমণও দেশে উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস ‘বি’-জনিত মৃত্যুর ৬৯ শতাংশ যে ১০টি দেশে সংঘটিত হয়েছে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। আজ মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এক বার্তায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এসব তথ্য জানিয়ে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের প্রতি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা আরও সম্প্রসারণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি বলেছে, কার্যকর টিকা, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসা থাকা সত্ত্বেও এখনো নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে লাখো মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জনসচেতনতার অভাব, দেরিতে রোগ নির্ণয়, সাশ্রয়ী মূল্যে পরীক্ষা ও চিকিৎসার সীমিত সুযোগ, সামাজিক অপবাদ এবং স্বাস্থ্যসেবার অসম প্রাপ্যতা ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের হুমকি হিসেবে নির্মূলের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রতিরোধে নিরাপদ ও কার্যকর টিকা বহু বছর ধরেই রয়েছে। অন্যদিকে হেপাটাইটিস ‘সি’ বর্তমানে কার্যকর ওষুধের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। তবু অধিকাংশ রোগী দীর্ঘদিন সংক্রমণের বিষয়টি জানতে পারেন না। কারণ এই রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। অনেকের ক্ষেত্রে লিভার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রোগ ধরা পড়ে, যখন চিকিৎসা জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে যায়।

বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ বলেন, ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধযোগ্য, চিকিৎসাযোগ্য এবং হেপাটাইটিস ‘সি’-এর ক্ষেত্রে নিরাময়যোগ্য। তবু অনেক মানুষ রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব কিংবা সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ না পাওয়ার কারণে জীবনরক্ষাকারী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি বলেন, বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির পথে বিদ্যমান সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০২০-২০৩০ সালের জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন, জন্মের পরপরই হেপাটাইটিস ‘বি’ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণের উদ্যোগ দেশের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহায়তায় এসব কার্যক্রম ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের হুমকি হিসেবে নির্মূলের জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এখনো বেশ কিছু কাঠামোগত ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে গেছে। অনেক মানুষ হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতন নন, ফলে তারা পরীক্ষা করান না। অনেক এলাকায় সহজে পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ নেই। অনেক রোগী সামাজিক অপবাদের ভয়ে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। এ ছাড়া দরিদ্র, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সেবার প্রাপ্যতা এখনো সীমিত।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চারটি অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপের কথা বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। প্রথমত, জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’ টিকাদান নিশ্চিত করা, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন ও নিরাপদ ইনজেকশন ব্যবস্থা জোরদার করা এবং ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, রক্ত সঞ্চালন, এইচআইভি ও যক্ষ্মা কর্মসূচির সঙ্গে হেপাটাইটিস পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা একীভূত করা, যাতে মানুষ নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবেই হেপাটাইটিস শনাক্ত ও চিকিৎসার সুযোগ পান। তৃতীয়ত, বিশেষায়িত হাসপাতালের বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সরলীকৃত হেপাটাইটিস ‘সি’ চিকিৎসা সম্প্রসারণ, সাশ্রয়ী মূল্যে পরীক্ষা ও ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং সেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা। এর ফলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় বিলম্ব কমবে এবং রোগীরা নিজ এলাকার কাছাকাছি মানসম্মত সেবা পাবেন। চতুর্থত, হেপাটাইটিস সংক্রমণ, চিকিৎসার ফলাফল, লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রোগের প্রকৃত বোঝা নিরূপণ, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী শনাক্ত, বিনিয়োগ ও নীতিনির্ধারণে অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং ২০৩০ সালের নির্মূল লক্ষ্যের অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য শক্তিশালী তথ্যব্যবস্থা অপরিহার্য।

ড. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ বলেন, ‘ভাইরাল হেপাটাইটিস মোকাবিলায় বাংলাদেশ দৃঢ় অঙ্গীকার প্রদর্শন করেছে এবং নির্মূলের পথে অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে দেশটি উপযুক্ত অবস্থানে রয়েছে। সরকারের এ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করতে পেরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গর্বিত এবং ভবিষ্যতেও কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রাখবে।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হেপাটাইটিস নির্মূলে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো পরীক্ষা, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, নবজাতকের জন্মের পরপরই টিকাদান নিশ্চিত করা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে হেপাটাইটিস সেবা একীভূত করার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের হুমকি হিসেবে নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. শাহেদ আশরাফ সেতু বলেন, ‘হেপাটাইটিস শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি পরিবারের জন্য বড় অর্থনৈতিক বোঝা। দেশে চিকিৎসা খরচের বড় অংশই রোগীদের বহন করতে হয়। হেপাটাইটিস ‘বি’ রোগীর আজীবন চিকিৎসা ও জটিলতার ব্যয় কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে তুলনামূলক অল্প খরচে টিকা ও সময়মতো পরীক্ষার মাধ্যমে এই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি থেকে পরিবারগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব।’