ঢাকা, বৃহস্পতিবার ৩০, জুলাই ২০২৬ ৪:৪০:২৬ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

বিশ্ব বাঘ দিবস: হুমকিতে বাঘের অভিযোজন 

নিজস্ব প্রতিবেদক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:০৩ এএম, ২৯ জুলাই ২০২৬ বুধবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

সুন্দরবনের অভ্যন্তরে পাঁচটি বিশাল নদীর কারণে পূর্ব-পশ্চিমে বাঘের চলাচল সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। বনে চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্য, খাদ্যসংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনে আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় বাঘের স্বাভাবিক গতিও ব্যাহত হচ্ছে। একই কারণে বাঘের দেহে সূক্ষ্ম জিনগত, কাঠামোগত ভিন্নতা তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে কমছে রোগ প্রতিরোধ ও অভিযোজনের ক্ষমতাও। বিশ্লেষকদের দাবি, গত দুই দশকে সুন্দরবনে বাঘের টিকে থাকার লড়াই আরও কঠিন হয়েছে। বাঘের জিনগত গঠন নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে। 
সুন্দরবন নিয়ে গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান ‘সুন্দরবন একাডেমি ট্রাস্ট’-এর নির্বাহী পরিচালক ফারুক আহমেদ বলেন, নানা কারণে বাঘ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। পাশাপাশি বাঘের খাদ্যসংকটও আছে। সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনে আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে আসছে।

দেশে বাঘের জনসংখ্যার জন্য বিদ্যমান এ পরিস্থিতিতে আজ ২৯ জুলাই বিশ্বজুড়ে ‘আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস’ পালিত হচ্ছে। বাঘের প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা এবং বাঘ সংরক্ষণে মানুষের সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতি বছর আনুষ্ঠানিকভাবে দিনটি পালন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে ও বনের চারটি রেঞ্জে আলাদাভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করা হবে।

২০২৪ সালের বাঘ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি। এর আগে ২০১৫ সালের বাঘশুমারি অনুযায়ী, সুন্দরবনে বাঘ ছিল ১০৬টি। ২০১৮ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ১১৪টি। আগের জরিপের চেয়ে ২০২৪ শুমারিতে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে ১১টি। জরিপে ২১টি বাঘ-শাবকের ছবি পাওয়া গেছে।

সুন্দরবনে বাঘ সুরক্ষায় ধারাবাহিক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে, জলোচ্ছ্বাসে বাঘ ও বন্যপ্রাণীর আশ্রয় নেওয়ার জন্য ২০টি স্থানে মাটির উঁচু টিলা (কেল্লা) ও তার পাশে পুকুর খনন করা হয়েছে। সেখানে বৃষ্টির পানি জমে মিষ্টি পানির সংস্থাপন হয়েছে। ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে দেখেছি- সেখানে বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী পানি খেতে আসছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে।  বনের অভ্যন্তরে যেসব জায়গায় বন্যপ্রাণী শিকারের সম্ভাবনা আছে এমন ২৫টি হটস্পট চিহ্নিত করে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে মনিটরিং করা হয়। তিনি বলেন, প্রকৃতিগত একই স্থানে থাকায় ইনব্লিডিং (আন্তঃপ্রজনন) হতে পারে। কিন্তু প্রতি বছর একটি বাঘিনি চার-পাঁচটা করে বাচ্চা দেয়। এর মধ্যে কয়টি টিকে থাকবে জানি না। তবে আমরা যদি বাঘের নিরাপদ আশ্রয় কনফার্ম করতে পারি তাহলে ভবিষ্যতে বাঘের সংখ্যা সমৃদ্ধ হবে। ইদানীং দুই-তিন দিনের মধ্যে বেশ কিছু বাঘের বিচরণের ভিডিও প্রচারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিন মাস বনে পর্যটক ও জেলে-বাওয়ালি প্রবেশ বন্ধ আছে। এর ফলে বনে বাঘের মুভমেন্টটা বেড়েছে। যেটা আগে তারা সহজে করতে পারত না।

স্বাধীনতার পর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হয় ১৯৭৩ সালে। ওই বছর বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশ জারির মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ শিকার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন সংশোধন করে বাঘ শিকার, হত্যা, পাচার ও অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়। এর ফলে বন বিভাগ আইনি ভিত্তিতে আরও কার্যকরভাবে বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করে।

বন বিভাগ জানায়, আইন কঠোর হলেও বহু বছর ধরে চলছে মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্ব। খাদ্যের সন্ধানে বা প্রাকৃতিক নানা কারণে বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়লে মানুষ দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে হত্যা করত। গত ২৪ বছরে পূর্ব সুন্দরবনে ৩০টিসহ মোট মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৯১টি বাঘের। এর মধ্যে পাচারকারী ও চোরাশিকারিদের হাতে নিহত হয়েছে ২৬টি। গ্রামবাসীর পিটুনিতে মারা গেছে ১৪টি। বনদস্যুদের হাতে প্রাণ গেছে ১৮টি। বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছে ২১টি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছে ৩টি। এর বাইরে বাঘের চামড়া উদ্ধারের মধ্য দিয়ে আরও অনেক বাঘ হত্যা ও পাচারের শিকার হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সেসব ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষিত নেই বন বিভাগের কাছে। অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী। তবে আশার কথা হচ্ছে ২০২৪ সালের পর সুন্দরবনে আর কোনো বাঘ পড়েনি।

বাঘ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজের মতে, শুধু আইন করলেই হবে না, বাঘ রক্ষা করতে হলে আগে হরিণ রক্ষা করতে হবে। কারণ হরিণ হচ্ছে বাঘের প্রধান খাদ্যপ্রাণী। হরিণ কমে গেলে ভেঙে পড়বে সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল। তাই চোরাশিকারিদের প্রতিরোধ করা জরুরি। তা ছাড়া জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে ধ্বংস হচ্ছে বাঘের নিরাপদ আবাসস্থল। বাঘ সংরক্ষণে সমন্বিতভাবে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে সরকারকে। অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, সুন্দরবনে অভ্যন্তরে ৫টি বিশাল নদীর কারণে পূর্ব-পশ্চিমে বাঘের চলাচল প্রকৃতগত সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। বনের অভ্যন্তরে সাতক্ষীরা থেকে চাঁদপাই, চাঁদপাই থেকে সাতক্ষীরা বা খুলনা থেকে সাতক্ষীরা এদিকে বাঘের চলাচল কম। ফলে বাঘের জেনেটিক স্ট্রাকচারে একটা পরিবর্তন তৈরি হয়েছে।