ঢাকা, শনিবার ০৮, আগস্ট ২০২৬ ১৭:৪৭:০১ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

ফারুক নওয়াজ: শিশুসাহিত্যের পথিকৃৎ

আইরীন নিয়াজী মান্না

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৩:২৬ পিএম, ৮ আগস্ট ২০২৬ শনিবার

শিশুসাহিত্যিক ফারুক নওয়াজ

শিশুসাহিত্যিক ফারুক নওয়াজ

বাংলা শিশুসাহিত্যে এমন লেখক খুব কমই জন্মায়, যারা কেবল কল্পনার শক্তি দিয়ে নয়, বরং ভাষার ছন্দ, চরিত্রের প্রাণ এবং শিশুর অনুভূতির সূক্ষ্মতা দিয়ে পাঠককে যুক্ত করতে পারেন। ফারুক নওয়াজ সেই সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান ব্যক্তি। তার রচনায় রয়েছে শিশুর সহজ-সরল মন, মানবিক বোধ, প্রকৃতির প্রতি প্রেম, এবং সামাজিক মূল্যবোধের সুর। শুধু শিশুসাহিত্যে নয়, তিনি ছোটদের চোখে বড় দুনিয়ার জটিলতাকে সহজভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন- যা তাকে সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করে বিশেষ স্থান দেয়।

ফারুক নওয়াজ বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল তারা। তার জন্ম এবং শৈশবকাল কেমন ছিল, তা বেশ কিছু উৎস থেকে জানা যায়—তিনি গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে প্রকৃতির প্রতি প্রগাঢ় অনুভূতি জন্ম নেয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি বইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। গ্রামের পুকুর, মাঠ, বৃক্ষ, পাখি—এগুলো তার কল্পনার জগৎকে পুষেছিল, যা পরে তার সাহিত্যে শিশুর ভেতরের দুনিয়ার সঙ্গে মিলে যায়।
শৈশবকালীন অভিজ্ঞতা এবং গ্রামীণ জীবনের দৃশ্যাবলী তার লেখায় প্রায়শই ফুটে ওঠে। এই অভিজ্ঞতা তাকে শিশুসাহিত্যে প্রকৃতির চিত্রায়ন এবং মানবিক চরিত্র নির্মাণে অনন্য সক্ষমতা দিয়েছে। তার সাহিত্যিক জীবন শুরু হয় কিশোর পত্রিকায় ছোট গল্প এবং ছড়া লেখার মাধ্যমে। ধীরে ধীরে তিনি কিশোর উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, ছড়া, কিশোর কবিতা, এবং ছোটদের মননের জগৎ খুলে দেওয়ার বিভিন্ন রচনায় প্রবল উপস্থিতি সৃষ্টি করেন।

সাহিত্যিক স্বভাব ও শৈলী: ফারুক নওয়াজের রচনার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-

সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষা:
তার ভাষা সরল, কিন্তু তা শিশুদের কল্পনার জগৎকে উন্মুক্ত করে। প্রতিটি শব্দ যেন শিশুর হৃদয়ে পৌঁছে। তিনি জটিল বিষয়কে সহজভাবে প্রকাশ করতে জানেন—যা শিশুদের বোঝার ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ছন্দ এবং লয়ের ব্যবহার:
ফারুক নওয়াজের লেখায় ছন্দের ব্যবহার চোখে পড়ে। তার গল্পে ও ছড়ায় ধ্বনিত শাব্দিক লয় শিশুর মনকে আকর্ষণ করে। এটি শুধু আনন্দের জন্য নয়—শিশুকে ভাষার সৌন্দর্য, ছন্দের খেলা শেখায়।

প্রকৃতি ও মানবিকতা:
গল্পের চরিত্র কিংবা ছড়ার বিষয়বস্তু সবসময় প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। পাখি, গাছ, নদী, আকাশ—এগুলো শিশুর কল্পনাশক্তিকে জাগ্রত করে এবং মানবিক মূল্যবোধ শেখায়। একই সঙ্গে তার রচনায় সহজ ভেদাভেদ, দেশপ্রেম, বন্ধুত্ব, দয়া, সাহস, এবং পরিবারের মূল্যবোধের চমৎকার নিদর্শন পাওয়া যায়।

শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি:
তিনি শিশুর চোখ দিয়ে জগৎ দেখেন। বড়দের জটিল চিন্তাভাবনাকে শিশুর মানসিকতায় মেলাতে পারতেন। শিশুর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, কৌতূহল, আনন্দ এবং দুঃখ—সবকিছু তার রচনায় উপস্থিত।

শিশুসাহিত্যে অবদান: ফারুক নওয়াজ শিশুসাহিত্যের প্রায় সকল ধারায় কাজ করছেন—ছড়া, কিশোর কবিতা, ছোট গল্প, কিশোর উপন্যাস, প্রবন্ধ। তাঁর কিছু রচনায় আমরা দেখতে পাই--

ছড়ার মাধ্যমে শিক্ষা: ছড়াগুলো শুধু মজা দেয় না, শিশুদের নৈতিক শিক্ষা দেয়। বন্ধুত্ব, সততা, সহমর্মিতা—সবকিছু সহজভাবে ফুটে ওঠে।

গল্পের মাধ্যমে মনন বিকাশ: গল্পে চরিত্র নির্মাণ ও পরিবেশকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা শিশুকে চিন্তা করতে শেখায়।

কিশোর সাহিত্য: ছোটদের বড় হওয়ার সময়ের জটিল অনুভূতিগুলো তিনি সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছেন। চরিত্রের দ্বন্দ্ব, আত্মবিশ্বাস, এবং সমাধানের পথ—সবকিছু শিক্ষামূলক হলেও আনন্দদায়ক।

শৈশবকালীন স্মৃতি, গ্রামের পরিবেশ, ছন্দময় ভাষা—সব মিলিয়ে তার সাহিত্য শিশুদের জন্য মননশীল এবং হৃদয়গ্রাহী।

শৈলী ও রচনার উদাহরণ: ফারুক নওয়াজের লেখা পড়লে বোঝা যায়, তার ছড়া, কবিতা ও গল্প কেবল শৈল্পিক নয়, বরং শিশুর অন্তরকে ছুঁয়ে যায়। সে যেখানে হাসি খুঁজে পায়, সেখানে শিক্ষাও যোগ হয়। তার গল্পের পটভূমি প্রায়শই গ্রামের পরিবেশ, ছোট শহর, বা প্রকৃতির কোনো দৃশ্য। চরিত্ররা সাধারণ—শিশু, বাবা-মা, বন্ধুরা, পোষ্য প্রাণী—কিন্তু তাদের মধ্য দিয়ে যে শিক্ষামূলক বার্তা প্রকাশ হয়, তা সহজে মনে থাকে। একই সঙ্গে কিশোর গল্পে অনুভূতির গভীরতা, সংলাপের প্রাণ, এবং ঘটনার বাস্তবতা থাকে।
তার ছড়ার ছন্দ, শব্দের খেলা, এবং সহজ কিন্তু প্রাঞ্জল বাচনভঙ্গি শিশুর ভাষা-অনুভবকে মেলাতে সহায়তা করে। তার ছড়া ও কিশোর কবিতায় আমরা বার বার মা-মাটি, প্রকৃতি, দেশ, মুক্তিযুদ্ধ ও সৌজন্যবোধের ছোঁয়া পাই। নিচে কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে পাঠকের কাছে। 

১.
যা-রে মন তুই যেখানে ইচ্ছে 
বাধা কে দিচ্ছে তোকে...
মেঘ ছুঁই-ছুঁই পাহাড় পেরিয়ে 
শ্যামল স্বর্গলোকে।
যেখানে ঝর্না রুপোলি উপল 
সরিয়ে হয়েছে নদী-
যা-রে মন তুই সেখানে নিজেকে 
হারাতে পারিস যদি।...
(যা-রে মন তুই )

এই লেখায় প্রকৃতিকে কি সাবলিলভাবে তিনি উপস্থাপন করেছেন। একই সাথে তিনি মায়ের মমতার কথা তুলে ধরেছেন গভীর ভালোবাসায়...

২.
এইতো ভোরের মিহিন হাওয়ায় আনন্দ-সুর শুনি
কোন সে বনে  টুনটুনিয়ে  ডাকল-রে টুনটুনি
আসছে ভেসে মেদুর সুবাস এলাচ-দারুচিনির
দিনটা কেমন মনরাঙানো খুশির বিকিকিনির
টুং-টুঙানো শব্দে দুচোখ এপাশ-ওপাশ করি
বাজছে কারো হাতের ছোঁয়ায় চামচ ও তস্তরি।
ঠিক মনে হয় মা বুঝি আজ রাঁধছে কতো কিছু
ইচ্ছে করে-- চুপচুপিয়ে দাঁড়াই না তার পিছু!...
হঠাৎ ভাবের ঘোর কেটে যায় যখন বুঝি শেষে
মা কী আছে? মা গিয়েছে হারিয়ে অচিন দেশে।
মা গিয়েছে সেই যে কবে নাওভাসানো ভোরে
মধুর আজান ভাসল যখন ধূসর নীলাম্বরে
গুটগুটিয়ার ঝোপের জুনি নিভায় যখন আলো
গাঙচিলেদের ডানায় যখন তটিনী চমকালো
ভোরের নদী নীলমোহনায় আছড়ে পড়ার আগে
মা গিয়েছে ফুল ফোটাতে অচিন কুসুমবাগে।...
(মা যদি না-থাকে)

আবার তার লেখায় আমরা ঋতুর কথা পাই ভিন্ন রূপে...


৩. 
হেমন্তকে শীত পাঠালো হিমেল হাওয়ার চিঠি
'আমরা মায়ের যমজ ছেলে দুজন পিঠাপিঠি
আয় চলে তুই জলদি করে এবার আমার পালা
তুই দিয়েছিস নতুন ফসল, ধানকাউনের ডালা
পরম সুখে চাষির ছেলে মাতল নবান্নতে—
এবার আমি কাঁপিয়ে দিতে আসব নিসর্গতে
উত্তুরে ওই হিমপাহাড়ের বরফ ছুঁয়ে ছুঁয়ে 
ছড়িয়ে দেবো শীতল হাওয়া থাকলে মানুষ শুয়ে।
(হেমন্তকে শীতের চিঠি)

সমকালীন প্রভাব: ফারুক নওয়াজ কেবল শিশুদের মনন বিকাশে অবদান রাখেননি, বরং বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনেছেন।শিশু-কিশোরদের জন্য বাংলা ভাষার সরল ও সৌন্দর্যপূর্ণ ব্যবহার শিখিয়েছেন।
কল্পনাশক্তি এবং সৃজনশীল চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটিয়েছেন। ছোটদের নৈতিকতা, সমাজবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ শেখানোর মাধ্যম তৈরি করেছেন। শিশুদের জন্য লেখা, ছড়া, গল্প—সবই তার পাঠ্য। শিক্ষক, অভিভাবক ও শিশু পাঠকরা তার সাহিত্যকে প্রেরণার উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

উপসংহার: ফারুক নওয়াজ শিশুসাহিত্যের একজন কিংবদন্তী। তার সাহিত্যিক শক্তি, প্রাঞ্জল ভাষা, এবং শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি তাকে অনন্য করে তোলে। শুধু গল্পের আনন্দ নয়—তার লেখায় শিক্ষার আলো, মানবিকতা, প্রকৃতির সৌন্দর্য, এবং শিশুর মননের গভীরতা সমানভাবে উপস্থিত।
বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে তার অবস্থান সেই ধ্রুপদী, যা পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। ফারুক নওয়াজের রচনা শিশুদের কল্পনার জগৎকে ছোঁয়, শিক্ষায় উদ্দীপ্ত করে এবং মানবিক মূল্যবোধে দৃঢ়তা আনে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে—শিশুসাহিত্য কেবল বিনোদন নয়, বরং মনন, শিক্ষা, এবং হৃদয়ের খেলার জায়গা।