ডেঙ্গু হলে পেঁপে পাতার রস খাওয়া কতটা নিরাপদ
স্বাস্থ্য ডেস্ক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১১:২২ এএম, ১৩ আগস্ট ২০২৬ বৃহস্পতিবার
সংগৃহীত ছবি
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে রক্তে অণুচক্রিকার (প্লেটলেট) মাত্রা কমে যাওয়া নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। আর তখনই অনেকেই অণুচক্রিকা বাড়ানোর আশায় রোগীকে পেঁপেপাতার রস খাওয়ান। কিন্তু ডেঙ্গুতে পেঁপে পাতার রস আদৌ কতটা উপকারী? চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বরং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি নিয়মিত খাওয়ানো নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অণুচক্রিকা কমলেই কি বিপদ?
ডেঙ্গুতে অণুচক্রিকার (প্লেটলেট) মাত্রা কমে যাওয়া খুবই পরিচিত একটি বিষয়। তবে শুধু অণুচক্রিকার (প্লেটলেট) সংখ্যা দেখেই রোগীর অবস্থা কতটা গুরুতর বা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি কতটা, তা নির্ধারণ করা যায় না।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে আরও গুরুতর কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে রক্তনালি থেকে রক্তের তরল অংশ বের হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
রক্তের তরল অংশ বেরিয়ে গেলে কী হয়?
ডেঙ্গুতে কখনো কখনো রক্তনালি থেকে রক্তের তরল অংশ বের হয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জমতে পারে। একে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়া বলা হয়।
এ ধরনের সমস্যা হলে ফুসফুসের চারপাশে বা পেটে তরল জমতে পারে। গুরুতর অবস্থায় রক্তচাপ কমে যেতে পারে এবং হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে। ফলে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পেঁপেপাতার রস কি অণুচক্রিকা বাড়ায়?
সীমিত পরিসরে করা কিছু গবেষণায় পেঁপে পাতার রস খাওয়ার সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর রক্তে অণুচক্রিকার মাত্রা বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব গবেষণায় পেঁপে পাতার রস তৈরির পদ্ধতি ও পরিমাণ এক ছিল না। ফলে এটি নিশ্চিতভাবে অণুচক্রিকা বাড়ায়—এমন সিদ্ধান্তে আসার সুযোগ নেই।
এছাড়া পেঁপেপাতার রস খেলে ডেঙ্গুর গুরুতর জটিলতা বা মৃত্যুঝুঁকি কমে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
ডেঙ্গুতে কমে যাওয়া অণুচক্রিকা অনেক সময় রোগের স্বাভাবিক গতিতেই পরে আবার বাড়তে শুরু করে। তাই পেঁপে পাতার রস খাওয়ার পর অণুচক্রিকার সংখ্যা বেড়ে গেলেই যে সেটি পেঁপেপাতার রসের কারণে হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ঘরোয়া টোটকার ওপর ভরসা কেন বিপজ্জনক?
পেঁপে পাতার রসকে চিকিৎসার বিকল্প মনে করলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়া। এতে ডেঙ্গুর গুরুতর জটিলতা দেরিতে শনাক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এছাড়া পেঁপে পাতার রস মানবদেহের জন্য কতটা নিরাপদ, সে বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত উচ্চমানের গবেষণা নেই। কিছু প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় যকৃতের ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে।
তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত পেঁপে পাতার রস খাওয়ানো বা খাওয়া ঠিক নয়।
শুধু অণুচক্রিকার সংখ্যা নয়, নজর দিতে হবে আরও অনেক কিছুর দিকে
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শুধু রক্তের অণুচক্রিকার সংখ্যা দেখলেই হবে না। রোগীর রক্তচাপ, হৃৎস্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং রক্তের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করেন। তাই ডেঙ্গু হলে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ ও পর্যবেক্ষণে থাকা জরুরি।
কোন ওষুধে সতর্ক থাকবেন?
জ্বর বা ব্যথার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেনসহ কিছু ব্যথানাশক ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই এসব ওষুধ নিজের ইচ্ছায় খাওয়া উচিত নয়।
এসব লক্ষণ দেখলে দ্রুত হাসপাতালে নিন
ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে কিছু বিপদসংকেত দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। যেমন—
তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তবমি, কালো পায়খানা, নাক, মাড়ি বা শরীরের অন্য কোথাও রক্তপাত, মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্বাভাবিক অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, ত্বক ঠান্ডা বা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক ঘুমভাব এবং আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বর কমে গেলেই ডেঙ্গু রোগী পুরোপুরি বিপদমুক্ত—এমনটা ভাবা ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমার সময় বা এরপরও জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই এই সময় বিপদসংকেতগুলোর দিকে বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন।
অণুচক্রিকা কমলেই কি রক্ত দিতে হয়?
ডেঙ্গুতে শুধু অণুচক্রিকার সংখ্যা কমেছে বলেই নিয়মিত অণুচক্রিকা (প্লেটলেট) দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। রোগীর রক্তক্ষরণ হচ্ছে কি না এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা কেমন—এসব বিষয় বিবেচনা করেই চিকিৎসক এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
তাই ডেঙ্গু হলে অণুচক্রিকার সংখ্যা নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে রোগীর সামগ্রিক অবস্থার দিকে নজর দেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই সবচেয়ে জরুরি।
