রাজধানীর সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি, বিপন্ন জনজীবন
জোসেফ সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১০:০২ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার
ছবি: সংগ্রহিত।
রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত—সড়কজুড়ে যেন খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসব। কোথাও ওয়াসার পানির লাইন, কোথাও গ্যাসের পাইপলাইন, কোথাও ড্রেনেজ কিংবা বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগের কাজ। আবার কোনো সড়কে এক সংস্থার কাজ শেষ হওয়ার আগেই শুরু হচ্ছে আরেক সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস রাস্তা কেটে ফেলে রাখায় দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। ধুলাবালি, যানজট, জলাবদ্ধতা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকির পাশাপাশি বেড়েছে মানুষের সময় ও অর্থের অপচয়।
রাজধানীর ধানমন্ডি, কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, রামপুরা, বাড্ডা, খিলগাঁও, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অনেক সড়কের একাংশ কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও মাটি ও ইটের স্তূপ, কোথাও খোলা নালা কিংবা গভীর গর্ত। রাতে এসব গর্তের পাশে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না থাকায় পথচারী ও যানবাহন চালকদের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
একই সড়কে বারবার খোঁড়াখুঁড়ি
নগরবাসীর অভিযোগ, রাজধানীতে সড়ক খোঁড়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দীর্ঘদিনের। একটি সংস্থা রাস্তা মেরামত করার পরপরই অন্য সংস্থা এসে আবার সেই সড়ক কেটে ফেলছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
ধানমন্ডির বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “একবার রাস্তা ঠিক করা হয়, কয়েক দিন পরই আবার দেখি রাস্তা কাটা হচ্ছে। কে কাটছে, কেন কাটছে—সেটা জানারও কোনো উপায় নেই। আমাদের প্রতিদিন এই ভাঙা রাস্তা দিয়ে চলতে হয়।”
কলাবাগানের এক পথচারী শারমিন আক্তার বলেন, “রাস্তার পাশে মাটি ফেলে রাখায় হাঁটার জায়গা থাকে না। গাড়ির ভিড়ের মধ্যে রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটতে হয়। একটু অসতর্ক হলেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
মিরপুরের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, “অফিসে যাওয়ার সময় প্রতিদিন অতিরিক্ত ৩০-৪০ মিনিট রাস্তায় আটকে থাকতে হয়। এক জায়গায় রাস্তা খোঁড়া, আরেক জায়গায় খোঁড়া—পুরো শহরটাই যেন নির্মাণকাজের মধ্যে আছে।”
ধুলোয় দুর্ভোগ
শুকনো আবহাওয়ায় খোঁড়া রাস্তা থেকে উড়ছে ধুলা। ব্যস্ত সড়কের পাশে নির্মাণসামগ্রী ও মাটি পড়ে থাকায় বাতাসে ধুলার পরিমাণ বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারী, রিকশাচালক, মোটরসাইকেল আরোহী ও দোকানিরা।
মালিবাগের এক দোকানি বলেন, “সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ধুলা উড়ছে। দোকানের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও রক্ষা পাওয়া যায় না। ক্রেতারাও রাস্তার অবস্থা দেখে অনেক সময় দোকানে আসতে চান না।”
সামান্য বৃষ্টিতেই বাড়ে ভোগান্তি
খোঁড়া রাস্তার আরেক বড় সমস্যা হলো বৃষ্টির পানি। সামান্য বৃষ্টি হলেই অনেক স্থানে গর্তে পানি জমে যায়। তখন বোঝার উপায় থাকে না কোথায় রাস্তা, কোথায় গর্ত। ফলে পথচারী ও মোটরসাইকেল চালকদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
রামপুরার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, “শুকনো সময়ে ধুলা, বৃষ্টি হলে পানি আর কাদা—দুই অবস্থাতেই ভোগান্তি। রাস্তা কাটার পর দ্রুত কাজ শেষ না করলে এমন দুর্ভোগ আরও বাড়বে।”
বাড়ছে যানজট
সড়কের একাংশ বন্ধ থাকায় স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় দুই লেনের রাস্তার এক লেন দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। ফলে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগী বহনকারী যানবাহন সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছে।
এক বাসচালক বলেন, “রাস্তার এক পাশ বন্ধ থাকলে গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে যায়। সামনে গর্ত, পাশে মাটি—তার মধ্যে আবার পথচারী। একটু ভুল হলেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
ফুটপাতও দখলে
সড়ক খোঁড়ার পাশাপাশি অনেক এলাকায় ফুটপাতেও রাখা হচ্ছে মাটি, বালু, ইট ও নির্মাণসামগ্রী। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে হাঁটতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে সড়ক খোঁড়ার আগে কাজের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জরুরি। একই সড়কে বারবার খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ না হলে জনদুর্ভোগ কমানো সম্ভব নয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, “বিভিন্ন সেবা সংস্থা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সড়ক কাটে। তবে সড়ক কাটার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম মেনে অনুমতি নেওয়া এবং কাজ শেষে দ্রুত রাস্তা পুনরুদ্ধারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেসব স্থানে কাজ শেষ হওয়ার পরও রাস্তা পুনরুদ্ধার করা হয়নি, সেসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, “সড়ক খোঁড়ার কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কাজ দ্রুত শেষ করে রাস্তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়। কোথাও নিয়ম না মানা হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।”
ঢাকা ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, “পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে অনেক এলাকায় জরুরি কাজ করতে হচ্ছে। তবে কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জনদুর্ভোগ যাতে কম হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই কাজ করা হচ্ছে।”
দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগের দাবি
নগরবাসীর প্রশ্ন—উন্নয়নকাজের জন্য রাস্তা খোঁড়া প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু কাজ শেষ করার পর মাসের পর মাস রাস্তা কেন ফেলে রাখা হবে? একই সড়ক বারবার খোঁড়ার আগে কেন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় হবে না?
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত খনন পরিকল্পনা থাকা জরুরি। কোন সড়কে কখন কোন সংস্থা কাজ করবে, কতদিন রাস্তা খোলা থাকবে এবং কাজ শেষে কত সময়ের মধ্যে রাস্তা পুনরুদ্ধার করতে হবে—এসব বিষয়ে কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, উন্নয়নকাজ থামবে না, কিন্তু সেই উন্নয়নের নামে জনজীবনও যেন বিপন্ন না হয়। সমন্বিত পরিকল্পনা, কঠোর তদারকি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাস্তা পুনরুদ্ধারই পারে রাজধানীর দীর্ঘদিনের এই খোঁড়াখুঁড়ির দুর্ভোগ থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে।
