ঢাকা, শনিবার ১৫, আগস্ট ২০২৬ ১৮:২৬:৩০ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

পাঁচ বছরেও বদলায়নি তালেবান, হতাশ আফগান নারীরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:১৬ পিএম, ১৫ আগস্ট ২০২৬ শনিবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

‎কাবুলের দক্ষিণের একটি গ্রামের সাদামাটা ভবনের নিচতলায় কয়েকজন তরুণী ব্যস্ত চেরি ও বরইয়ের জ্যাম তৈরিতে। কেউ বড় পাত্রে ফল নাড়ছেন, কেউ কাচের বোতলে লেবেল লাগাচ্ছেন। তালেবানশাসিত আফগানিস্তানে নারীদের দক্ষতা অর্জন ও কাজের সুযোগ এখন খুবই সীমিত। তাই এই ছোট উদ্যোগটিই অনেক নারীর জন্য আশার জায়গা।

এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৪৭ বছর বয়সী আফগান নারী উদ্যোক্তা নাজিয়া। ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হওয়া নাজিয়া নয় সন্তানের মা। তার মেয়েসহ এই কর্মশালার অনেক তরুণীরই আজ স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার কথা ছিল। কিন্তু তালেবান সরকার মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় তাদের সেই পথ বন্ধ।

এখন কর্মক্ষেত্রেও বাড়ছে নতুন বাধা। সাম্প্রতিক নিয়ম অনুযায়ী, নারীরা নিজেরা বাজারে পণ্য নিতে পারবেন না; তাদের পণ্য বিক্রির জন্য পুরুষের সহায়তা নিতে হবে। বাণিজ্য মেলাতেও নারীদের বদলে পুরুষদের পণ্য প্রদর্শনের নিয়ম করা হয়েছে।

নাজিয়া বলেন, তালেবানের সঙ্গে বিশ্বের অন্যভাবে কথা বলা প্রয়োজন। কারণ এখন পর্যন্ত যে পদ্ধতিতে চাপ দেওয়া হয়েছে, তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আফগান নারীদের জীবন বদলানো জরুরি, কারণ তারা ধীরে ধীরে আশা হারিয়ে ফেলছেন।

পাঁচ বছরেও বদলায়নি পরিস্থিতি

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে নারীদের জনজীবনের বড় অংশ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের স্কুলে যাওয়াও বন্ধ।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ আফগান কোনো না কোনো ধরনের বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সংঘাত এবং বিভিন্ন দেশ থেকে আফগানদের ফেরত পাঠানোর ঘটনায় দেশটির মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তালেবান সরকার নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। তারা কর আদায় করছে এবং খনিজ, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে চীন, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উজবেকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি করছে।

রাশিয়া এখন পর্যন্ত তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া একমাত্র দেশ। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আফগান দূতাবাসের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে তালেবানের হাতে যাচ্ছে। বর্তমানে ৪০টির বেশি আফগান দূতাবাস তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, সম্পর্কের উন্নতি করতে হলে দূর থেকে কথা না বলে কূটনৈতিকভাবে আরও কাছাকাছি আসতে হবে।

চাপ নয়, আলোচনার পথ?

জাতিসংঘ মনে করছে, তালেবানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, অগ্রগতি ধীর, সীমিত এবং অনেক সময় আবার পিছিয়েও যায়। তারপরও কোনো আলোচনা না থাকার চেয়ে আলোচনা চলমান থাকা ভালো।

তবে আফগান নারী অধিকারকর্মী ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বলছে, শুধু আলোচনা করে লাভ হচ্ছে না। তাদের মতে, তালেবানের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে স্পষ্ট শর্ত দিতে হবে। বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে বাস্তব পরিবর্তন ছাড়া সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়া উচিত নয়।

আফগান অধিকারকর্মী মাহবুবা সেরাজ বলেন, গত পাঁচ বছরে নারীদের জন্য বাস্তব পরিবর্তন খুবই কম। তার পরিচালিত নির্যাতিত নারীদের আশ্রয়কেন্দ্রও গত ডিসেম্বরে বন্ধ হয়ে গেছে।

তবে হতাশা থাকলেও তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তালেবানের সঙ্গে কথা চালিয়ে যেতে হবে। তবে সেই আলোচনা যেন শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচ বছর পর এসে পরিষ্কার হয়েছে যে, শুধু আন্তর্জাতিক চাপ দিয়ে তালেবানের নীতি পরিবর্তন করানো সহজ নয়। আবার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ আফগান জনগণ।

নাজিয়ার জ্যাম তৈরির ছোট কর্মশালার মতো সীমিত কিছু উদ্যোগ এখনো আফগান নারীদের সামনে টিকে থাকার সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু নতুন নতুন বিধিনিষেধের মধ্যে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

পাঁচ বছর পরও তাই আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিশ্বের সঙ্গে আলোচনায় কি বদলাবে তালেবান, নাকি পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আফগান সমাজের ভেতর থেকেই?