মালিবাগ বাজার রোডের শোচনীয় অবস্থা, ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরা রাজপথ
অনু সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৭:৩৯ পিএম, ১৭ আগস্ট ২০২৬ সোমবার
মালিবাগ বাজার রোডের শোচনীয় অবস্থা, ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরা রাজপথ
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকাগুলোর একটি মালিবাগ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ নানা প্রয়োজনে এ এলাকার সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। অথচ মালিবাগ বাজার রোডের বর্তমান চিত্র নগরবাসীর জন্য স্বস্তির বদলে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কের বিভিন্ন অংশে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত ও খানাখন্দ। কোথাও উঠে গেছে পিচ, কোথাও বেরিয়ে এসেছে ইট-সুরকি। বৃষ্টির পানি জমলে এসব গর্ত আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ফলে পথচারী, রিকশা-অটোরিকশার যাত্রী থেকে শুরু করে বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদেরও প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে একদিকে যেমন যানবাহনের গতি কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় গর্তের গভীরতা বোঝা না যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সামান্য বৃষ্টিতেই বাড়ে দুর্ভোগ: মালিবাগ বাজার রোডের কয়েকটি অংশে বৃষ্টির পানি জমে সড়কের গর্তগুলো অনেক সময় চোখের আড়ালে চলে যায়। তখন রিকশা, মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহন চালকদের অনেকটা আন্দাজ করে এগোতে হয়। হঠাৎ গর্তে চাকা পড়ে গেলে যানবাহনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি যাত্রীদেরও দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।
এর আগে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও মালিবাগ এলাকার সড়কের ভাঙাচোরা অবস্থা ও বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে মালিবাগ বাজার রোডের সরু অংশে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে পথচারীদের চলাচলে মারাত্মক দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল।
পথচারীদের অভিযোগ, ‘হেঁটে চলাই কঠিন’: মালিবাগ বাজারে নিয়মিত যাতায়াতকারী এক পথচারীর ভাষ্য, রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে একটু অসতর্ক হলেই পা গর্তে পড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, নারী ও শিশুদের চলাচলে সমস্যা বেশি।
এক এলাকাবাসী বলেন, “বাজারে যাওয়ার জন্য প্রতিদিন এই রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু রাস্তার অবস্থা দেখে মনে হয়, আমরা রাজধানীর কোনো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নয়, প্রত্যন্ত কোনো এলাকার ভাঙা রাস্তা দিয়ে চলাচল করছি। বৃষ্টি হলে সমস্যা আরও বেড়ে যায়।”
আরেক পথচারী বলেন, “রাস্তার গর্তগুলো সব সময় স্পষ্ট দেখা যায় না। বৃষ্টির পানি জমে গেলে কোন জায়গা কত গভীর বোঝা যায় না। রিকশা বা মোটরসাইকেল হঠাৎ গর্তে পড়লে যাত্রীরাও ভয় পেয়ে যান।”
চালকদেরও নাভিশ্বাস: সড়কের বেহাল দশায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকেরা। গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে অনেক সময় তাদের মূল লেন থেকে সরে যেতে হয়। এতে অন্য যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়।
এক রিকশাচালক বলেন, “গর্তের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালালে রিকশার চাকা ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হয়। আবার গর্ত এড়াতে গিয়ে পাশ দিয়ে যাওয়া গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগার ভয় থাকে। যাত্রী নিয়েও খুব সাবধানে চালাতে হয়।”
এক সিএনজি অটোরিকশাচালকের ভাষ্য, “রাস্তা ভালো থাকলে যে পথ অল্প সময়ে যাওয়া যায়, এখন সেখানে ধীরে ধীরে চালাতে হয়। গর্তে চাকা পড়লে গাড়ির ক্ষতি হয়। যাত্রীরাও বিরক্ত হন। বৃষ্টি হলে অবস্থা আরও খারাপ।”
রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক নিয়ে চালকদের সঙ্গে কথা বলে করা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে মালিবাগ এলাকার ভাঙা সড়ক এবং বৃষ্টির সময় যানজট বাড়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে: সড়কের গর্ত ও উঁচু-নিচু অংশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য। একটি গর্ত এড়াতে গিয়ে চালককে হঠাৎ ব্রেক করতে হলে পেছন থেকে আসা যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকে। একইভাবে রিকশার চাকা গর্তে পড়ে গেলে যাত্রী পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুধু গর্ত মেরামত করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সড়কের নিচের ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশন এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার রাস্তা কাটার বিষয়েও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
পুরোনো সমস্যা, সমাধান কোথায়?: মালিবাগ-গুলবাগ এলাকার সড়কের বেহাল দশা নতুন নয়। ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে মালিবাগ বাজার থেকে রেললাইন পর্যন্ত সড়কসহ আশপাশের বিভিন্ন সড়কে খানাখন্দ, স্যুয়ারেজের পানি জমে থাকা এবং পথচারীদের দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এমনকি ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে মালিবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে খানাখন্দ ও ভাঙাচোরা অবস্থার কথা উঠে আসে। সেখানে বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সড়কের পিচ উঠে যাওয়ার কথাও বলা হয়।
অর্থাৎ বছরের পর বছর ধরে সমস্যাটি ঘুরেফিরে থাকলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না—এমন অভিযোগ এলাকাবাসীর।
ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত: মালিবাগ বাজারকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য দোকানপাট ও ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে বাজারে আসা-যাওয়া কঠিন হয়ে পড়লে তার প্রভাব পড়ে ব্যবসায়ও।
এক ব্যবসায়ী বলেন, “রাস্তা খারাপ থাকলে অনেক ক্রেতাই অল্প সময়ের জন্য বাজারে আসতে চান না। বৃষ্টি হলে তো পরিস্থিতি আরও খারাপ। রাস্তার সামনে পানি ও কাদা জমলে দোকানের সামনে দাঁড়ানোও কঠিন হয়ে পড়ে।”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন: এলাকাবাসীর প্রশ্ন—সড়কটি নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা কী? কোথায় কোথায় জরুরি সংস্কার প্রয়োজন, তার তালিকা তৈরি হয়েছে কি না এবং কবে নাগাদ কাজ শুরু হবে—এসব বিষয়ে দ্রুত স্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমরা চাই না সাময়িকভাবে গর্তে ইট বা মাটি ফেলে দায়িত্ব শেষ করা হোক। কিছুদিন পর আবার একই জায়গায় গর্ত তৈরি হয়। টেকসইভাবে রাস্তা সংস্কার করতে হবে।”
সমন্বিত উদ্যোগই সমাধান: নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর একটি সড়ক মেরামতের পর অন্য কোনো সেবা সংস্থা যদি আবার সেটি কেটে ফেলে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সড়ক সংস্কারের পাশাপাশি পানি, পয়োনিষ্কাশন, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
মালিবাগ বাজার রোডের ক্ষেত্রেও শুধু গর্ত ভরাট নয়, সড়কের স্থায়িত্ব, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দিকে নজর দেওয়ার দাবি এলাকাবাসীর।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকার এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করেন। তাই সড়কটি দ্রুত সংস্কার করে নিরাপদ ও চলাচলযোগ্য করার দাবি এখন স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী, যাত্রী এবং চালকদেরও।
মালিবাগ বাজার রোড যেন আর দুর্ভোগের প্রতিশব্দ না হয়—এটাই এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।
