ঢাকা, মঙ্গলবার ১৮, আগস্ট ২০২৬ ১৮:০২:০৮ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

দুই শতাব্দী কি ছুঁতে পারবে পুরান ঢাকার টমটম?

রাতুল মাঝি

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৭:৫৯ পিএম, ১৭ আগস্ট ২০২৬ সোমবার

পুরান ঢাকার টমটম

পুরান ঢাকার টমটম

রাজধানী ঢাকা শহর এখন কংক্রিটের বিশাল এক নগরী। চারদিকে উঁচু ভবন, অসংখ্য বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, রিকশা আর মানুষের অবিরাম ছুটে চলা। যানজটের শব্দে যেখানে দিনের অধিকাংশ সময় মুখর রাজধানী, সেখানে পুরান ঢাকার কোনো কোনো গলিতে এখনো হঠাৎ শোনা যায় ঘোড়ার ক্ষুরের পরিচিত শব্দ—‘টগবগ, টগবগ’। শব্দটি যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য বর্তমানকে সরিয়ে নিয়ে যায় দুই শতাব্দী আগের ঢাকায়।

এই ঘোড়ার গাড়িই পুরান ঢাকার টমটম। একসময় যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আভিজাত্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সময়ের স্রোতে আধুনিক যানবাহন এসে দখল করেছে শহরের সড়ক। কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টমটম এখনো ছুটছে সদরঘাট-গুলিস্তানের পথে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—১৮৩০ সালে যে ঘোড়ার গাড়ির যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি কি দুই শতাব্দীর দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারবে?

আভিজাত্যের বাহন থেকে গণপরিবহন

ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ১৮৩০ সালের দিকে পুরান ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয়। সে সময় এটি ছিল আভিজাত্য ও বিত্তের প্রতীক। জমিদার ও অভিজাত শ্রেণির যাতায়াতের পাশাপাশি ব্যবসায়িক কাজেও ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করা হতো। ঢাকার বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আর্মেনীয় ব্যবসায়ীরাও মালপত্র পরিবহনে ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করতেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।

ক্রমে এই বাহন শুধু বিত্তবানদের বাহন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নগরজীবনের সঙ্গে মিশে গিয়ে হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম।

একসময় সদরঘাট থেকে গুলিস্তানসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন রুটে বিপুলসংখ্যক ঘোড়ার গাড়ি চলাচল করত। ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ, কোচোয়ানের হাঁক আর যাত্রীদের ওঠানামা—সব মিলিয়ে পুরান ঢাকার রাস্তাঘাটের পরিচিত দৃশ্য ছিল টমটম।

এখনো ছুটছে ২২ থেকে ২৭টি গাড়ি

সময়ের সঙ্গে টমটমের সংখ্যা কমতে কমতে এখন হাতেগোনা। সদরঘাট-গুলিস্তান রুটে বর্তমানে আনুমানিক ২২ থেকে ২৭টি ঘোড়ার গাড়ি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলাচল করছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

একেকটি গাড়িতে প্রায় ১৫টি আসন থাকলেও পূর্ণ যাত্রী নিয়ে নিয়মিত যাত্রা করতে পারছে না অনেক গাড়ি।

বাংলাবাজার মোড়, সদরঘাট কিংবা গুলিস্তানের আশপাশে দাঁড়িয়ে কোচোয়ান ও হেল্পারদের যাত্রী ডাকতে দেখা যায়। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত যাত্রী মেলে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে একটি গাড়ি দিনে পাঁচ থেকে সাতটি পর্যন্ত ট্রিপ দিতে পারত। এখন অনেক ক্ষেত্রে তা কমে তিন থেকে চারটিতে দাঁড়িয়েছে।

৩০ টাকার যাত্রা, কিন্তু আয় কত?

সদরঘাট থেকে গুলিস্তান কিংবা গুলিস্তান থেকে সদরঘাট—টমটমের ভাড়া বর্তমানে ৩০ টাকা। ভাড়া তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এখনো কিছু যাত্রী এই বাহন ব্যবহার করেন। তবে যাত্রী কমে যাওয়ায় আসন পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষা করতে গেলে গাড়ি ছাড়তে দেরি হয়। আবার যাত্রী কম থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গাড়ি চালাতে হয়।

একটি গাড়িতে ৫ থেকে ৭ জন যাত্রী উঠলেই অনেক সময় সেটি গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে আসনপ্রতি পূর্ণ যাত্রী না পাওয়ায় আয়ও কমে যায়।কোচোয়ানদের অভিযোগ, মালিকের জমার টাকা, ঘোড়ার খাবার, পরিচর্যা, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিজেদের দৈনন্দিন খরচ মিটিয়ে হাতে খুব সামান্য অর্থ থাকে।

ঘোড়ার খাবারের খরচই বড় বোঝা

টমটম টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন ঘোড়া পালন।

কোচোয়ান ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আগে একটি ঘোড়ার পেছনে দৈনিক প্রায় ৪০০ টাকা ব্যয় হলেও বর্তমানে খাবার ও পরিচর্যার খরচ বেড়ে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে।

ঘোড়ার খাবারের মধ্যে থাকে খড়, ঘাস, ভুসি, ছোলা, বিভিন্ন ধরনের খাদ্যশস্য ও প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর উপাদান। এর সঙ্গে রয়েছে চিকিৎসা, পরিচর্যা ও অসুস্থ হলে অতিরিক্ত খরচ।

একটি ঘোড়া অসুস্থ হয়ে পড়লে শুধু সেদিনের আয় বন্ধ হয় না, চিকিৎসার খরচও বহন করতে হয়। কোচোয়ানদের ভাষায়, ঘোড়া ভালো থাকলেই গাড়ি চলবে, আর গাড়ি চললেই আয় হবে।

‘এখন যাত্রী পেতে লড়াই করতে হয়’

টমটমের কোচোয়ান সিদ্দিক মিয়া বলেন, “এখন যাত্রী পেতে লড়াই করতে হয়। আগে সিরিয়াল অনুযায়ী গাড়ি চলত। এখন যে যখন পারছে যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে। দিনশেষে মালিকের জমার টাকা ঠিকই দিতে হয়, কিন্তু আমাদের হাতে খুব কম টাকা থাকে। ২০০-৩০০ টাকা আয় করে সংসার চালানো কঠিন।”

তার কথায় স্পষ্ট, ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার আবেগ থাকলেও বাস্তব জীবনের অর্থনৈতিক চাপ দিন দিন বাড়ছে।

আরেক কোচোয়ান বলেন, “মানুষ এখন দ্রুত যেতে চায়। বাস, সিএনজি, মোটরসাইকেল—সবই দ্রুত চলে। ঘোড়ার গাড়িতে সময় বেশি লাগে। তাই তরুণরা খুব একটা ওঠে না। যারা ওঠেন, তাদের অনেকেই পুরান ঢাকার টানেই ওঠেন।”

কেন এখনো টমটমে ওঠেন মানুষ?

আধুনিক গণপরিবহনের ভিড়ে টমটমের গতি ধীর। তবুও এর যাত্রী একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। সদরঘাট-গুলিস্তান রুটে এখনো কিছু মধ্যবয়সী ও বয়স্ক মানুষ নিয়মিত বা মাঝেমধ্যে টমটমে ওঠেন। তাদের কাছে এটি শুধু পরিবহন নয়, স্মৃতির অংশ।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, “একসময় ঘোড়ার গাড়িই ছিল ভরসা। এখন বাস অনেক দ্রুত যায়। তবুও আমি মাঝে মাঝে ঘোড়ার গাড়িতে উঠি। এই গাড়ির সঙ্গে আমাদের ছোটবেলা, পুরান ঢাকার স্মৃতি—অনেক কিছু জড়িয়ে আছে।”

আরেক যাত্রীর ভাষায়, “বাসে উঠে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়, কিন্তু টমটমে উঠলে পুরান ঢাকাকে অনুভব করা যায়।” এই অনুভূতিই হয়তো এখনো টমটমকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

তরুণ প্রজন্মের কাছে হারাচ্ছে পরিচিতি

টমটমের আরেকটি বড় সংকট হলো নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এর দূরত্ব তৈরি হওয়া। যে প্রজন্ম ঘোড়ার গাড়িকে শুধু ইতিহাসের বই, পুরোনো ছবি কিংবা সিনেমায় দেখছে, তাদের কাছে টমটম বাস্তব জীবনের পরিবহনের অংশ নয়। ফলে এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু গাড়ি চালু রাখাই যথেষ্ট নয়। নতুন প্রজন্মকে এর ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করাতে হবে।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য ঐতিহ্যবাহী ঢাকা ভ্রমণ, হেরিটেজ ওয়াক কিংবা নির্দিষ্ট দিনে টমটম রাইডের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

পর্যটনের বড় সম্পদ হতে পারে টমটম

পুরান ঢাকাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, টমটম সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, বড় কাটরা, ছোট কাটরা, চকবাজার, তারা মসজিদ, সদরঘাট ও বুড়িগঙ্গাকে যুক্ত করে একটি ‘হেরিটেজ টমটম রুট’ চালু করা যেতে পারে।

দেশি-বিদেশি পর্যটকরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টমটম ভাড়া করে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক এলাকা ঘুরতে পারবেন। সঙ্গে থাকতে পারেন প্রশিক্ষিত গাইড। তাহলে টমটম শুধু পুরোনো একটি পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে নয়, একটি ঐতিহ্যবাহী পর্যটন পণ্য হিসেবে নতুন জীবন পেতে পারে।

প্রয়োজন আধুনিক ব্যবস্থাপনা

টমটমের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে এর পরিচালন ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনতে হবে।

প্রথমত, ঘোড়ার কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত খাবার, বিশ্রাম, পানি, চিকিৎসা ও ছায়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অতিরিক্ত সময় ঘোড়াকে কাজে লাগানো যাবে না।

দ্বিতীয়ত, কোচোয়ানদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পর্যটকদের সঙ্গে আচরণ, ট্রাফিক আইন, প্রাথমিক চিকিৎসা ও ঘোড়ার পরিচর্যা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।

তৃতীয়ত, গাড়িগুলোকে নান্দনিক ও ঐতিহ্যসম্মতভাবে সংস্কার করা দরকার। প্রতিটি গাড়িতে ঐতিহাসিক তথ্য, রুটের নাম এবং পর্যটন তথ্য রাখা যেতে পারে।

সরকারি প্রণোদনা ছাড়া টিকে থাকা কঠিন

কোচোয়ানদের মতে, শুধু যাত্রীদের ভালোবাসায় এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা কঠিন। কারণ টমটমের সঙ্গে একটি পরিবারের জীবিকা জড়িত, আবার একটি ঘোড়া পালন করাও ব্যয়বহুল।

তাই সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ঘোড়ার খাবার ও চিকিৎসায় ভর্তুকি, কোচোয়ানদের প্রণোদনা এবং গাড়ি সংস্কারের জন্য সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে টমটমকে ঐতিহ্যবাহী পরিবহন হিসেবে সরকারি তালিকাভুক্ত করে এর সুরক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা করা প্রয়োজন।

শুধু আবেগ দিয়ে বাঁচবে না টমটম

পুরান ঢাকার টমটমের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই—এটি কি শুধু মানুষের নস্টালজিয়ার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকবে, নাকি নতুন অর্থনৈতিক পরিচয় পাবে?

বাস্তবতা হলো, কেবল স্মৃতির ওপর কোনো পেশা টিকে থাকে না। টমটমকে টিকিয়ে রাখতে হলে এর সঙ্গে আয় ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি করতে হবে।

পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে সেই সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পর্যটকরা নির্দিষ্ট ভাড়ায় টমটমে ঘুরবেন, ঐতিহ্যবাহী রুটে ভ্রমণ করবেন, ছবি তুলবেন, ইতিহাস জানবেন। এতে কোচোয়ানদের আয় বাড়বে এবং টমটম চালানোর পেশাটিও নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।

২০০ বছর পূর্তির অপেক্ষা

১৮৩০ থেকে ২০২৬—প্রায় ১৯৬ বছর। অর্থাৎ আরও মাত্র চার বছর পরেই পুরান ঢাকার টমটম দুই শতাব্দীর ইতিহাস ছুঁতে পারে। কিন্তু সেই দিন পর্যন্ত টমটমগুলো টিকে থাকবে তো?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনই নিশ্চিত নয়। কারণ প্রতিদিনের লোকসান, ঘোড়ার খাবারের ব্যয়, যাত্রী সংকট, যানজট এবং আধুনিক পরিবহনের প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে ঐতিহ্যের এই বাহনটি কঠিন সময় পার করছে।

তবুও সদরঘাটের কোনো এক প্রান্তে যখন একটি টমটম ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, কোচোয়ান ঘোড়ার লাগাম টানেন আর ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ পুরান ঢাকার ব্যস্ততার মধ্যে মিশে যায়, তখন মনে হয়—ঢাকা এখনো তার অতীতকে পুরোপুরি ভুলে যায়নি।

দুই শতাব্দীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে পুরান ঢাকার টমটম এখন শুধু একটি ঘোড়ার গাড়ি নয়; এটি একটি শহরের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের চলমান প্রতীক।

এখন দায়িত্ব—এই প্রতীকটিকে শুধু ছবির পাতায় নয়, বাস্তব ঢাকার রাজপথেও বাঁচিয়ে রাখা। দুই শতাব্দী পূর্ণ করার দিনে যেন টমটমের গল্প বলতে হয় অতীত কালের ভাষায়—‘একসময় পুরান ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ি চলত’—তা যেন না হয়।