সম্মান পেতে জনভোজে অংশ নিতেন রোমান নারীরা
উইমেননিউজ২৪ ডেস্কঃ
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১১:০৬ এএম, ১৯ আগস্ট ২০২৬ বুধবার
সংগৃহীত ছবি
প্রাচীন রোমে জনসাধারণের ভোজ মানেই শুধু পুরুষদের আয়োজন— এমন ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ধনী রোমান নারীরাও এসব ভোজের পেছনে অর্থ ব্যয় করতেন।
এর মাধ্যমে তারা সমাজে নিজেদের ও পরিবারের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতেন।
গবেষণায় খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের শেষভাগ থেকে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতক পর্যন্ত সময়ের হিস্পানিয়ার ৩৬টি লাতিন শিলালিপি পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি ভোজের অর্থ দিয়েছিলেন নারীরা। ১৪টির খরচ বহন করেছিলেন পুরুষরা।
আর দুটি ভোজে নারী ও পুরুষ উভয়েই অর্থ দিয়েছিলেন। রোমান সমাজে জনকল্যাণে অর্থ ব্যয় করা সাধারণত পুরুষদের নাগরিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই নারীদের এমন ভূমিকার প্রমাণ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এসব আনুষ্ঠানিক জনসাধারণের ভোজকে বলা হতো ‘এপুলা’।
অনেক সময় ধর্মীয় আচার, পশু বলি, মূর্তি স্থাপন বা কোনো ভবন উৎসর্গের পর এসব ভোজের আয়োজন করা হতো। শহরের মানুষ সেখানে একসঙ্গে খাবার খেতেন।
কোনো ধনী ব্যক্তি বা নারী যখন এমন ভোজের খরচ দিতেন, তখন সেটি শুধু মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা ছিল না। শিলালিপিতে দাতার নামও তুলে ধরা হতো। ফলে তার দানশীলতা ও পরিবারের মর্যাদার কথা দীর্ঘদিন মনে রাখার সুযোগ তৈরি হতো।
হিস্পানিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রমাণ পাওয়া গেছে বায়েতিকা অঞ্চলে। ৩৬টি ভোজের ২৯টির তথ্যই এই এলাকা থেকে এসেছে। নারীদের অর্থায়নে হওয়া ২০টি ভোজের মধ্যে ১৭টির তথ্যও বায়েতিকা থেকে পাওয়া গেছে। মুনিগুয়া, কার্তিমা ও নেসকানিয়াসহ কয়েকটি শহরেও এমন উদাহরণ মিলেছে।
অনেক নারী নিজের সম্পদ ব্যবহার করে স্বামী, সন্তান, বাবা বা অন্য আত্মীয়দের সম্মান জানাতেন। গবেষণার ২০টি শিলালিপির মধ্যে ১২টিতে নারীর দেওয়া ভোজের সঙ্গে কোনো সম্মাননা বা মূর্তি স্থাপনের কথাও রয়েছে। অর্থাৎ ভোজ ছিল একই সঙ্গে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা স্মরণ এবং দাতা নারীর নিজের সামাজিক পরিচয় তুলে ধরার একটি উপায়। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়া ডি. এফ. রুস্তিকার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। তিনি জনকল্যাণে নিজের সম্পদ থেকে বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় করেছিলেন। একটি বারান্দা পুনর্নির্মাণ, সরকারি কর পরিশোধ, গোসলখানার জন্য জমি দান, দেবতা মার্সের ব্রোঞ্জের মূর্তি তৈরি- এমন নানা কাজের পাশাপাশি তিনি একটি ভোজ ও দুটি ঘোড়ায় চড়া মূর্তির খরচও বহন করেছিলেন।
নারীরা যে নিজের অর্থেই এসব দান করতেন, শিলালিপিতে তারও উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রায় ৭০ শতাংশ নারী দাতার শিলালিপিতে ‘সুয়া পেকুনিয়া’ কথাটি রয়েছে। এর অর্থ ‘নিজের অর্থ দিয়ে’। এর মাধ্যমে দানের সঙ্গে ওই নারীর ব্যক্তিগত সম্পদ ও পরিচয়ের সম্পর্ক স্পষ্ট করা হতো। ধর্মীয় দায়িত্বও নারীদের জনজীবনে ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দিত। গবেষণায় ছয়জন নারী পুরোহিত বা ‘ফ্লামিনিকা’র তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের অনেকেই সম্রাটের উপাসনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে ধর্মীয় দায়িত্বের কারণে শহরের মানুষের কাছেও তাদের আলাদা মর্যাদা তৈরি হয়েছিল।
বায়েবিয়া সি. এফ. ক্রিনিতা নামে এক নারী পুরোহিত তার উইলে একটি ভোজ এবং অ্যাপোলো ও ডায়ানার জন্য একটি মন্দির নির্মাণে অর্থ রেখে যান। নিজের সম্মানে মূর্তি স্থাপনের শর্তও দিয়েছিলেন তিনি। মন্দির নির্মাণে তার দানের পরিমাণ ছিল ২ লাখ সেস্টারস। শুধু ভোজের আয়োজক হিসেবেই নয়, অতিথি হিসেবেও নারীদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিছু শিলালিপিতে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য ভোজের কথা রয়েছে। কখনো আবার দুই দলের জন্য আলাদাভাবে খাবারের ব্যবস্থাও করা হতো।
ইতালির তিনটি শিলালিপিতে আরো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে শুধু নারীদের জন্য আয়োজিত ভোজের কথাও রয়েছে। এক ক্ষেত্রে প্রত্যেক নারীকে খাবারের পাশাপাশি দুই সেস্টারস করে দেওয়া হয়েছিল। অন্য একটি ভোজে পরিষদ সদস্যদের মা, বোন, মেয়ে এবং বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির নারী নাগরিকদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে এর মানে এই নয় যে রোমান সমাজে নারীরা পুরুষদের মতো সমান নাগরিক ক্ষমতা ভোগ করতেন। আনুষ্ঠানিক জনজীবনে পুরুষ অভিজাত ও স্থানীয় পরিষদের সদস্যদের গুরুত্বই ছিল বেশি। নারীদের ভূমিকা তৈরি হয়েছিল সেই সময়ের সামাজিক ও পারিবারিক নিয়মের মধ্যেই।
তারপরও শিলালিপিগুলোতে ধনী নারীদের শুধু পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, দাতা, ধর্মীয় কর্মকর্তা, উত্তরাধিকারী এবং নাগরিক সমাজের অংশ হিসেবেও দেখা যায়। গবেষণায় থাকা নারী দাতাদের প্রায় ৪০ শতাংশ ছিলেন বিবাহিত। ১৭ শতাংশকে কন্যা হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। প্রায় অর্ধেকের ক্ষেত্রে তাদের বৈবাহিক বা পারিবারিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। সব মিলিয়ে গবেষণাটি প্রাচীন রোমের জনজীবনে নারীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এত দিন তুলনামূলকভাবে আড়ালে থাকা ভূমিকা সামনে এনেছে। নারীরা জনসাধারণের ভোজে অর্থ দিতেন, কখনো এসব ভোজে অংশ নিতেন, আবার কখনো শুধু নারীদের জন্য আয়োজিত ভোজেও খাবার পেতেন।
এসব ভোজের মাধ্যমে তারা শহরের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের ও পরিবারের নামও স্মরণীয় করে রাখতেন। ফলে প্রাচীন রোমে জনসাধারণের ভোজ শুধু খাবারের আয়োজন ছিল না; এটি ছিল সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক স্মৃতি এবং জনজীবনে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
