ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২০, আগস্ট ২০২৬ ১৭:২৮:৫৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

শহীদ কবি মেহেরুন্নেসার জন্মদিন আজ

অনু সরকার

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:২৭ এএম, ২০ আগস্ট ২০২৬ বৃহস্পতিবার

শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা

শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা

কবিতার জন্য মানুষের জীবন কতটা উজ্জ্বল হতে পারে, আর একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্নের জন্য সেই জীবন কতটা নির্মমভাবে নিভে যেতে পারে—শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা তার এক অসামান্য উদাহরণ।

আজ ২০ আগস্ট। ১৯৪২ সালের এই দিনে কলকাতার খিদিরপুরে জন্মেছিলেন মেহেরুন্নেসা। মাত্র ২৯ বছরের জীবন। অথচ সেই ছোট্ট জীবনের ভেতর তিনি রেখে গেছেন কবিতা, স্বপ্ন, সাহস আর দেশপ্রেমের এমন এক উত্তরাধিকার, যা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁকে অনন্য করে রেখেছে।

তাঁর ডাকনাম ছিল রানু। ছোটবেলা থেকেই কবিতার প্রতি ছিল গভীর টান। মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। পরে ‘সংবাদ’, ‘ইত্তেফাক’, ‘দৈনিক পাকিস্তান’, ‘বেগম’, ‘কাফেলা’সহ সে সময়ের বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। খুব অল্প বয়সেই তিনি নিজের জন্য তৈরি করে নিয়েছিলেন সাহিত্যজগতের একটি স্বতন্ত্র জায়গা।

কিন্তু মেহেরুন্নেসা শুধু কবিতার মানুষ ছিলেন না। সময় তাঁকে ধীরে ধীরে রাজনীতি ও মানুষের অধিকারের প্রশ্নের কাছেও নিয়ে যায়। ষাটের দশকের আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি যুক্ত হন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়েও তাঁর কলম ছিল সক্রিয়। ‘রানু আপা’ নামে রাজনৈতিক লেখাও লিখতেন তিনি।

মিরপুরের যে সময়ে বাঙালি পরিবারগুলো ছিল সংখ্যালঘু এবং চারপাশে ছিল প্রবল বৈরিতা, সেই পরিবেশেই নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন মেহেরুন্নেসা। মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় তিনি ছিলেন দৃঢ়। ১৯৭১ সালের শুরুতে মিরপুরে গড়ে ওঠা অ্যাকশন কমিটির সক্রিয় সদস্যও ছিলেন তিনি।

তারপর আসে সেই ঐতিহাসিক মার্চ।

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ। চারদিকে স্বাধীনতার উত্তাল হাওয়া। সেদিন মিরপুরের নিজ বাড়িতে দুই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করেছিলেন মেহেরুন্নেসা। চারপাশের হুমকি-ধমকিকে উপেক্ষা করে তাঁর কণ্ঠে ছিল ‘জয় বাংলা’।

সেদিনই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে লেখক সংগ্রাম শিবিরের আয়োজনে বিপ্লবী কবিতাপাঠের আসরে অংশ নেন তিনি। সেখানে দেশের খ্যাতিমান কবিদের সঙ্গে নিজের লেখা কবিতা পাঠ করেন মেহেরুন্নেসা। তাঁর ‘জনতা জেগেছে’ কবিতাটি যেন সেই সময়েরই প্রতিচ্ছবি—একটি জাতির জেগে ওঠার ঘোষণা।

কিন্তু কবিতার সেই কণ্ঠ আর বেশিদিন শোনা গেল না।

২৫ মার্চের কালরাতের পর মিরপুরও হয়ে ওঠে ভয় আর মৃত্যুর জনপদ। স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া মেহেরুন্নেসা ও তাঁর পরিবার তখন ঘাতকদের নজরে।

২৭ মার্চ। মাত্র চার দিন আগে যে তরুণী নিজের বাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন, সেদিনই তাঁর বাড়িতে হামলা হয়। মেহেরুন্নেসার সঙ্গে তাঁর মা নূরুননেসা এবং দুই ভাইও নির্মম হত্যার শিকার হন।

মেহেরুন্নেসার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটি সম্ভবত এখানেই—তিনি চাইলে হয়তো অন্য কোথাও চলে যেতে পারতেন। কিন্তু মা ও দুই ভাইকে রেখে তিনি যেতে চাননি। পরিবারকে সঙ্গে নিয়েই থেকে গিয়েছিলেন নিজের বাড়িতে। আর সেই বাড়িই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের শেষ ঠিকানা।

মৃত্যুর মাত্র তিন দিন আগে তাঁর শেষ কবিতা ‘জনতা জেগেছে’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘বেগম’ পত্রিকায়। একজন কবির জীবনের শেষ প্রকাশিত কবিতা যখন হয়ে ওঠে একটি জাতির জেগে ওঠার ঘোষণা, তখন তাঁর জীবন আর নিছক ব্যক্তিগত জীবন থাকে না—তা হয়ে যায় ইতিহাসের অংশ।

মেহেরুন্নেসা বেঁচে থাকলে হয়তো বাংলা কবিতা আরও অনেক কবিতা পেত। হয়তো তাঁর কলম আরও পরিণত হতো, আরও অনেক প্রেম, প্রকৃতি, মানুষ ও দেশের কথা লিখত। হয়তো বাংলা সাহিত্যে তাঁর নাম আজ আরও বড় করে উচ্চারিত হতো।

কিন্তু ইতিহাস তাঁকে সেই সময় দেয়নি।

তাঁর জীবন থেমে গেছে ২৯ বছর বয়সে। কবিতার খাতা থেমে গেছে। কলম থেমে গেছে। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন থামেনি।

কারণ তিনি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাংলাদেশ আজও তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

আজ তাঁর জন্মদিনে তাই শুধু একজন কবিকে স্মরণ করার দিন নয়। এটি একজন তরুণীর স্বপ্নকে স্মরণ করার দিন। এমন একজন নারীর কথা মনে করার দিন, যিনি ভয়কে অতিক্রম করেছিলেন, প্রতিকূলতার মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়ে গেছেন।

মেহেরুন্নেসার জীবন আমাদের একটি সহজ অথচ গভীর কথা মনে করিয়ে দেয়—কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের স্বপ্ন থেকে যায়।

আজ ২০ আগস্ট সেই স্বপ্নের কবির জন্মদিন।

শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর অশেষ কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি বাংলাদেশের প্রথম নারী শহীদ কবিদের অন্যতম এই সাহসী সন্তানকে।

শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা—তোমার কবিতার শব্দ আজও আমাদের স্বাধীনতার আকাশে প্রতিধ্বনিত হয়।