ফোন হারালে প্রথম ৩০ মিনিটে কী করবেন
প্রযুক্তি ডেস্ক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১২:২৩ পিএম, ২২ আগস্ট ২০২৬ শনিবার
সংগৃহীত ছবি
মোবাইল ফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ব্যক্তিগত ছবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব, ইমেইল, ব্যাংকিং সেবা, মোবাইল আর্থিক সেবা, গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং অসংখ্য ব্যক্তিগত তথ্য একটি ফোনের মধ্যেই থাকে। তাই ফোন হারিয়ে গেলে শুধু ফোনটি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করলেই হবে না, একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ফোন হারানোর পর প্রথম ৩০ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে কয়েকটি সঠিক পদক্ষেপ দ্রুত নিতে পারলে ফোন উদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়তে পারে এবং ফোনের অপব্যবহার ঠেকানো সম্ভব হয়।
প্রথম ৫ মিনিট: আতঙ্কিত না হয়ে ফোনটি খুঁজুন
ফোনটি কোথায় হারিয়েছে তা প্রথমে মনে করার চেষ্টা করুন। সর্বশেষ কোথায় ফোনটি ব্যবহার করেছেন, কোন গাড়িতে উঠেছিলেন, কোন দোকান বা প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলেন কিংবা কোথায় বসেছিলেন, তা দ্রুত মিলিয়ে দেখুন।
অন্য একটি ফোন থেকে নিজের নম্বরে কল করুন। কাছাকাছি কোথাও ফোন পড়ে থাকলে রিং শুনে পাওয়া যেতে পারে। তবে ফোনটি চুরি হয়েছে বলে সন্দেহ হলে অপরিচিত কারও সঙ্গে একা গিয়ে মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।
৫ থেকে ১০ মিনিট: ফোনের অবস্থান শনাক্ত করুন
অ্যান্ড্রয়েড ফোন হলে অন্য একটি ফোন বা কম্পিউটার থেকে গুগলের ‘ফাইন্ড হাব’ ব্যবহার করে ফোনের অবস্থান দেখার চেষ্টা করা যায়। ফোনে প্রয়োজনীয় সেটিংস চালু থাকলে এর মাধ্যমে ফোনের অবস্থান দেখা, শব্দ বাজানো, দূর থেকে ফোনটি সুরক্ষিত করা এবং প্রয়োজন হলে তথ্য মুছে ফেলার সুবিধা রয়েছে।
আইফোন হলে ‘ফাইন্ড মাই’ ব্যবহার করে ফোনের অবস্থান দেখা এবং ‘লস্ট মোড’ চালু করা যায়। অ্যাপলের নির্দেশনা অনুযায়ী, ফোন চুরি হয়ে গেলে যত দ্রুত সম্ভব ‘লস্ট মোড’ চালু করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে ফোনটি লক করা যায় এবং পর্দায় যোগাযোগের তথ্য দেখানোর সুযোগ থাকে।
তবে মানচিত্রে ফোনের অবস্থান দেখা গেলেও নিজে গিয়ে চোরকে ধরার চেষ্টা করা ঠিক নয়। অবস্থানটি পুলিশকে জানানোই নিরাপদ।
১০ থেকে ১৫ মিনিট: ফোন লক করুন এবং হিসাবগুলো সুরক্ষিত করুন
ফোনের অবস্থান নিশ্চিত না হলে কিংবা ফোনটি অন্য কারও হাতে চলে গেছে বলে মনে হলে দ্রুত সেটি দূর থেকে লক করুন। ফোনে বিকল্প যোগাযোগ নম্বর দেওয়ার সুযোগ থাকলে এমন একটি নম্বর দিন, যেটিতে আপনাকে পাওয়া যাবে।
এরপর গুরুত্বপূর্ণ হিসাবগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। বিশেষ করে ইমেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যাংকিং এবং মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাবের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
ফোনে ব্যাংকিং বা আর্থিক সেবার হিসাব চালু থাকলে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। সন্দেহজনক লেনদেন দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত মাধ্যমে যোগাযোগ করে হিসাব সুরক্ষিত করুন।
১৫ থেকে ২০ মিনিট: সিম বন্ধ করার ব্যবস্থা নিন
ফোন হারানোর সঙ্গে সঙ্গে সিম কার্ডের নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবতে হবে। কারণ অন্য কেউ সিমটি ব্যবহার করতে পারলে কল, বার্তা বা যাচাইকরণ কোডের মাধ্যমে বিভিন্ন হিসাবের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তাই মোবাইল অপারেটরের অনুমোদিত গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করে হারানো সিম বন্ধ বা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করা উচিত। নতুন সিম নেওয়ার সময় নিজের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র লাগতে পারে।
২০ থেকে ২৫ মিনিট: আইএমইআই নম্বর খুঁজে রাখুন
মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ফোনের স্বতন্ত্র পরিচয় নম্বর। ফোনের বাক্স, ক্রয় রসিদ বা আগে সংরক্ষণ করে রাখা তথ্য থেকে আইএমইআই নম্বর পাওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশের ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার ব্যবস্থায় আইএমইআই নম্বরের মাধ্যমে ফোনের বৈধতা ও অবস্থাসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা যায়। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ১৫ সংখ্যার আইএমইআই নম্বরের আগে ‘কেওয়াইডি’ লিখে ১৬০০২ নম্বরে পাঠিয়ে হ্যান্ডসেটের বৈধতা যাচাই করা যায়।
বর্তমানে বাংলাদেশে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু রয়েছে। বিটিআরসি জানিয়েছে, নেটওয়ার্কে সচল মোবাইল ফোনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হয়েছে।
এ কারণে ফোন হারানোর পর আইএমইআই নম্বরটি জিডি ও প্রয়োজনীয় পরবর্তী প্রক্রিয়ায় কাজে লাগতে পারে।
২৫ থেকে ৩০ মিনিট: পুলিশকে জানান এবং জিডি করুন
ফোনটি খুঁজে না পাওয়া গেলে দ্রুত থানায় সাধারণ ডায়েরি করার উদ্যোগ নিন। বাংলাদেশ পুলিশের অনলাইন জিডি ব্যবস্থাতেও হারানো সম্পদের বিষয়ে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট থানা ব্যবস্থা নেয় এবং জিডি গ্রহণযোগ্য হলে ডিজিটাল জিডির কপি দেওয়া হয়।
অনলাইন জিডির জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, সচল মোবাইল নম্বর ও লাইভ ছবি প্রয়োজন হতে পারে। ঘটনার সময়, স্থান, হারানো ফোনের বিবরণ এবং প্রয়োজনীয় নথি যুক্ত করা যায়।
জিডিতে ফোনের ব্র্যান্ড, মডেল, রং, ব্যবহৃত নম্বর এবং আইএমইআই নম্বর উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ। ফোনটি চুরি হয়েছে নাকি কোথাও পড়ে গেছে, সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
শুধু ফোন নয়, তথ্যও বাঁচাতে হবে
ফোন হারানোর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অনেক সময় ফোনটির দাম নয়, এর ভেতরের তথ্য। একটি ফোনে থাকা ব্যক্তিগত ছবি, পরিচিতদের নম্বর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব, ইমেইল, নথি ও আর্থিক সেবার তথ্য অন্যের হাতে গেলে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
তাই ফোন খুঁজে পাওয়ার আশায় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে দেরি করা উচিত নয়। প্রথমে ফোনটি খোঁজা, তারপর দূর থেকে লক করা, সিমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ হিসাবগুলো সুরক্ষিত করা উচিত।
ফোন ফেরত পাওয়ার নামে প্রতারণা থেকেও সাবধান
ফোন হারানোর পর কেউ যদি ফোন ফেরত দেওয়ার কথা বলে ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড, যাচাইকরণ কোড বা অর্থ দাবি করে, সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে কোনো অচেনা লিংকে গিয়ে গুগল বা অ্যাপলের হিসাবের পাসওয়ার্ড দেওয়া উচিত নয়।
বিটিআরসি জানিয়েছে, ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার সম্পর্কিত সেবা নেওয়ার জন্য নির্ধারিত সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করতে হবে এবং অননুমোদিত ওয়েবসাইট বা লিংকে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া যাবে না।
যা আগে থেকেই করে রাখবেন
ফোন হারানোর পর দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হলে প্রস্তুতিও আগে থেকে থাকা দরকার। ফোনের আইএমইআই নম্বর, ক্রয় রসিদ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য নিরাপদ জায়গায় সংরক্ষণ করা ভালো। গুরুত্বপূর্ণ হিসাবগুলোতে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু রাখা উচিত। অ্যান্ড্রয়েডে ‘ফাইন্ড হাব’ এবং আইফোনে ‘ফাইন্ড মাই’ আগে থেকেই ঠিকভাবে চালু আছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করে রাখা দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফোন হারানোর পর প্রথম ৩০ মিনিট শুধু ফোন খোঁজার সময় নয়, নিজের তথ্য, অর্থ ও পরিচয় সুরক্ষিত করার সময়। দ্রুত কিন্তু শান্তভাবে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়াই পারে একটি ছোট দুর্ঘটনাকে বড় নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হওয়া থেকে ঠেকাতে।
মনে রাখুন: ফোন হারালে আগে খুঁজুন, তারপর লক করুন, সিম সুরক্ষিত করুন, আর্থিক হিসাব নিরাপদ করুন, আইএমইআই সংরক্ষণ করুন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত জিডি করুন।
