মার্কিন সেনাবাহিনীতে যৌন নিপীড়নের শিকার ২০ হাজারের বেশি সদস্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১২:২৯ পিএম, ২৩ আগস্ট ২০২৬ রবিবার
সংগৃহীত ছবি
মার্কিন সামরিক বাহিনীতে যৌন নিপীড়নের ঘটনা কমেছে। তবে ২০২৫ সালেও দেশটির সক্রিয় দায়িত্বে থাকা ২০ হাজারের বেশি সেনাসদস্য যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সময়ে এসব ঘটনার আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সংখ্যা বেড়েছে।
শুক্রবার প্রকাশিত মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে আনুমানিক ২০ হাজার ৪৯২ জন সক্রিয় দায়িত্বে থাকা সেনাসদস্য যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৯ হাজার ৮৬০ জন নারী এবং ১০ হাজার ৬৩২ জন পুরুষ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২৯ হাজার। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে যৌন নিপীড়নের আনুমানিক সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কমেছে। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫ হাজার ৯০০।
সামরিক বাহিনীর নারী সদস্যদের মধ্যে যৌন নিপীড়নের হার ২০২৩ সালের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে কমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। পুরুষ সদস্যদের ক্ষেত্রে এই হার ১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১ শতাংশে নেমেছে।
তবে ঘটনার সংখ্যা কমলেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে যৌন নিপীড়নের ৭ হাজার ৯৯৮টি অভিযোগ জমা পড়ে। প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আনুমানিক আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেছেন। ২০২৩ সালে এই হার ছিল চারজনের একজন।
পেন্টাগন বলছে, যৌন নিপীড়নের ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সদস্যদের চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও অন্যান্য পুনরুদ্ধারমূলক সেবার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনীতে যৌন নিপীড়নের পাশাপাশি যৌন হয়রানির ঘটনাও কমেছে। ২০২৫ সালে আনুমানিক ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বা ৪৪ হাজার ৬৫৬ জন সেনাসদস্য যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
নারী সদস্যদের মধ্যে যৌন হয়রানির হার ২০২৩ সালের ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে।
বাহিনীভেদেও যৌন নিপীড়নের হারে পার্থক্য রয়েছে। নারী সদস্যদের মধ্যে মেরিন কোরে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন সংস্পর্শের হার সবচেয়ে বেশি ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। পুরুষ সদস্যদের ক্ষেত্রে নৌবাহিনীতে এই হার ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে বিমানবাহিনীতে নারী সদস্যদের মধ্যে এই হার ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পুরুষ সদস্যদের মধ্যে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ ছিল, যা বাহিনীগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সামরিক সদস্যদের আস্থাও কিছুটা বেড়েছে। ২০২৫ সালে ৭২ শতাংশ নারী এবং ৮০ শতাংশ পুরুষ সদস্য মনে করেছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করা হয়েছে।
তবে নারী সদস্যদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি এখনো রয়েছে। যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ ট্রায়াল কাউন্সেলের বিষয়ে ৬৫ শতাংশ পুরুষ সদস্য ইতিবাচক আস্থা প্রকাশ করলেও নারীদের মধ্যে এ হার ছিল ৪৪ শতাংশ।
যৌন নিপীড়নের ঘটনা প্রকাশ না করার ক্ষেত্রে প্রতিশোধের আশঙ্কাও বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন সংস্পর্শের অভিজ্ঞতা থাকা নারী সদস্যদের ১৭ শতাংশ আইনবিরোধী প্রতিশোধের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। পুরুষ ও নারী উভয় সদস্যের ক্ষেত্রেই সহকর্মী ও সহযোদ্ধাদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা অভিযোগ না করার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩ সালে গুরুতর অপরাধ, যার মধ্যে যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক সহিংসতা, হত্যা ও অনিচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড রয়েছে, সেগুলোর বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বাধীন আইনি কাঠামো চালু করা হয়। এর আওতায় বিশেষ ট্রায়াল কাউন্সেলের কার্যালয় এসব মামলার তদন্ত ও বিচারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সরাসরি পরিচালনা করে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মী ও প্রস্তুতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অ্যান্টনি টাটা বলেন, মর্যাদা, সম্মান ও শৃঙ্খলা সামরিক বাহিনীর আদর্শ এবং সামগ্রিক প্রস্তুতির ভিত্তি। যৌন নিপীড়ন ও যৌন হয়রানি এসব মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ণ করে, আস্থা নষ্ট করে এবং সামরিক অভিযানের সাফল্যকে হুমকির মুখে ফেলে।
তবে সামরিক বাহিনীতে যৌন নিপীড়ন কমার সরকারি হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অধিকারকর্মী সংগঠন প্রটেক্ট আওয়ার ডিফেন্ডার্স। সংগঠনটির দাবি, ২০২৫ সালের তথ্যকে সরাসরি অগ্রগতি হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাদের বক্তব্য, যৌন নিপীড়নের ঘটনা কমে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে আক্রান্তদের অভিযোগ করতে অনীহা।
সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট জশ কনলি বলেন, বাস্তবে তাঁরা যে পরিস্থিতি দেখছেন, তার সঙ্গে এসব সংখ্যার পুরোপুরি মিল নেই। তাঁর দাবি, আগের তুলনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অভিযোগ করার ভয় বেড়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য বলছে, সামরিক বাহিনীতে যৌন নিপীড়ন ও যৌন হয়রানি কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ ও অভিযোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের মূল্যায়ন, বিভিন্ন সামরিক শাখার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং ইউনিট পর্যায়ে কার্যক্রম পর্যালোচনার মতো পদক্ষেপ রয়েছে।
সূত্র: এএফপি, এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড
