ঢাকা, মঙ্গলবার ২৫, আগস্ট ২০২৬ ৫:৪৩:১৯ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

চুলায় গ্যাস নেই, কলে পানি নেই: তীব্র দুর্ভোগে মালিবাগবাসী

জোসেফ সরকার

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৫২ পিএম, ২৪ আগস্ট ২০২৬ সোমবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

চুলায় গ্যাস নেই, কলে পানি নেই। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎও যাচ্ছে নিয়মিত। একদিকে রান্না নিয়ে দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে খাবার ও ব্যবহারযোগ্য পানির জন্য হাহাকার—এভাবেই দিন কাটছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের। তবে এই দুর্ভোগ যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে মালিবাগে। টানা সাত দিন ধরে মালিবাগের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে পানি নেই। কোথাও একেবারেই পানি আসছে না, আবার কোথাও দীর্ঘ অপেক্ষার পর অল্প পানি এলেও তা ব্যবহারের উপযোগী নয় বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।

মালিবাগের বাসিন্দাদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—পানি কোথায়?

সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে পানির খোঁজ করা। কল খুলে পানি না পেয়ে অনেকেই বোতল, জার ও বড় পাত্র নিয়ে ছুটছেন আশপাশের দোকান কিংবা পানির সরবরাহকারীদের কাছে। কেউ পানির গাড়ির অপেক্ষায় থাকছেন, কেউ কিনে আনছেন বোতলজাত পানি। সাত দিন ধরে এভাবে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে বাড়তি অর্থের পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে কর্মজীবী মানুষের মূল্যবান সময়।

বিশেষ করে মালিবাগের পরিবারগুলোর দুর্ভোগ বেড়েছে রান্নার সময়। খাবার পানি আলাদাভাবে কিনতে হচ্ছে, আবার রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া, বাসন পরিষ্কার ও টয়লেট ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পানি। ফলে শুধু খাবার পানি কিনলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

একই সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলছে গ্যাসের তীব্র সংকট। দিনের বড় একটা সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না অথবা চাপ এতটাই কম যে রান্না করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে পানি ও গ্যাস—দুই সংকট একসঙ্গে নগরজীবনকে প্রায় অচল করে দিচ্ছে।

মালিবাগে সাত দিন ধরে পানির অপেক্ষা

মালিবাগের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা সাত দিন ধরে পানি সংকট চললেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি সরবরাহ। একটি পরিবারের জন্য একদিন পানি না থাকা যেমন কষ্টকর, টানা সাত দিন পানি না থাকা তার চেয়ে বহুগুণ বেশি দুর্ভোগের।

বাসিন্দাদের কেউ কেউ জানান, পানি সংগ্রহের জন্য দিনের বিভিন্ন সময়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কখন পানি আসবে, আদৌ আসবে কি না—তারও নিশ্চয়তা নেই। ফলে দৈনন্দিন কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি থাকছে না।

মালিবাগের অনেক বাসায় শিশু ও বয়স্ক সদস্য রয়েছেন। তাদের গোসল, পরিচ্ছন্নতা ও প্রয়োজনীয় ব্যবহারের পানির ব্যবস্থা করতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের নাভিশ্বাস উঠছে। কর্মজীবী নারী-পুরুষদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও প্রকট। অফিসে যাওয়ার আগে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, আবার ফিরে এসে পানির ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।

একজন বাসিন্দার ভাষায়, “গ্যাস না থাকলে কোনোভাবে খাবার বাইরে থেকে আনা যায়, কিন্তু পানি ছাড়া তো একটা পরিবার চলতেই পারে না।”

পানির সঙ্গে বাড়ছে সংসারের খরচ

পানি সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, বাড়ছে পরিবারের ব্যয়ও। মালিবাগে অনেক পরিবারকে বাজার থেকে বোতলজাত পানি কিনতে হচ্ছে। কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করা পানি সংগ্রহ করছেন। কিন্তু সেই পানি দিয়ে গোসল, কাপড় ধোয়া কিংবা ঘরের অন্যান্য কাজ করা সম্ভব নয়। এসব কাজে আলাদা পানির প্রয়োজন হচ্ছে।

অন্যদিকে গ্যাসের সংকটে রান্না করতে হচ্ছে বিকল্প ব্যবস্থায়। কেউ ব্যবহার করছেন ইন্ডাকশন চুলা, কেউ বৈদ্যুতিক কুকার, আবার কেউ বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনছেন।

ফলে মালিবাগের একটি পরিবারের ওপর একই সময়ে পানি ও রান্নার জ্বালানির বাড়তি খরচ চাপছে।

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য এই বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। মাসের নির্দিষ্ট আয় থেকে বাসাভাড়া, বাজার, সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ মেটানোর পর পানি ও রান্নার বিকল্প জ্বালানির জন্য অতিরিক্ত টাকা বের করা অনেকের কাছেই বড় বোঝা।

শুধু মালিবাগ নয়, সংকট রাজধানীজুড়ে

পানির সংকটের অভিযোগ রয়েছে রাজধানীর আরও বিভিন্ন এলাকায়। বাসাবো, কদমতলা, মুগদা, খিলগাঁও, মাটির মসজিদ এলাকা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১১, মনিপুর ও খিলক্ষেতের বাসিন্দারাও পানি সরবরাহ নিয়ে দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন।

কোথাও দীর্ঘ সময় পানি থাকে না, আবার কোথাও কল খুললে ময়লা, হলদেটে বা দুর্গন্ধযুক্ত পানি বের হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমন পানি পান করা তো দূরের কথা, রান্না কিংবা গৃহস্থালির কাজেও ব্যবহার করতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে।

আগস্টের শুরুতেও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় পানির জন্য কলসি-বালতি হাতে মানুষের অপেক্ষার খবর সামনে এসেছিল। অর্থাৎ রাজধানীর পানি সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতারই প্রতিফলন।

গ্যাস সংকটে রান্নাঘরও অচল

পানির পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকটও প্রকট হয়েছে। দিনের বড় একটি সময় চুলায় গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবারকে রান্নার সময় পরিবর্তন করতে হচ্ছে। কেউ ভোরে উঠে রান্না করছেন, কেউ রাতে গ্যাসের অপেক্ষায় থাকছেন।

মালিবাগেও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে পানি না থাকার সঙ্গে গ্যাস সংকট যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে।

গ্যাস না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে ইন্ডাকশন বা এলপিজি ব্যবহার করছেন। এতে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়। কারও কারও ক্ষেত্রে মাসে অতিরিক্ত এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তীব্র গরমে বিদ্যুৎ সংকট বাড়াচ্ছে দুর্ভোগ

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে লোডশেডিং। গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘরে থাকা যেমন কষ্টকর হয়ে পড়ে, তেমনি পানি না থাকায় গোসল বা প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতার কাজও করা যায় না।

একজন নগরবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একদিকে পানি নেই, অন্যদিকে গ্যাস নেই। বিদ্যুৎও থাকে না। তাহলে মানুষ থাকবে কীভাবে?”

এই প্রশ্ন শুধু একজনের নয়। মালিবাগসহ রাজধানীর বহু মানুষের একই প্রশ্ন।

পরিকল্পনার অভাব কতটা দায়ী?

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জনসংখ্যা ও ভবনের সংখ্যা বাড়লেও নাগরিক সেবার অবকাঠামো সেই হারে উন্নত হয়নি। ফলে পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশন—প্রতিটি ব্যবস্থার ওপর বাড়ছে অতিরিক্ত চাপ।

ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেছেন, নগর উন্নয়নের সঙ্গে নাগরিক সেবার সক্ষমতার সমন্বয় জরুরি। তাঁর মতে, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পানির স্তর ক্রমেই নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। ২০০০ সালের দিকে যেখানে ৩০-৪০ মিটার গভীরতায় পানি পাওয়া যেত, বর্তমানে কোথাও কোথাও তা ১২০ মিটার পর্যন্ত নেমেছে।

নগর পরিকল্পনায় পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো মৌলিক সেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে সংকট আরও বাড়তে পারে।

সমাধান কোথায়?

মালিবাগের বাসিন্দারা সাত দিন ধরে পানির অপেক্ষায় আছেন। তাদের কাছে এখন বড় কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা নয়—প্রথম প্রয়োজন কল খুললে পানি পাওয়া।

একইভাবে চুলায় নিয়মিত গ্যাস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং নিরাপদ পানি—এসব কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলো একটি নগরের মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার।

রাজধানীর মানুষ প্রতিদিন পানি ও গ্যাসের জন্য যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন, বিকল্প জ্বালানি ও পানি কিনতে গিয়ে সংসারের বাজেট নষ্ট করেন, তাহলে নগর উন্নয়নের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

মালিবাগে সাত দিন ধরে পানি নেই—এই একটি ঘটনা যেন ঢাকার সামগ্রিক নাগরিক ব্যবস্থাপনার জন্যই একটি সতর্কবার্তা।

আজ মালিবাগে পানি নেই, কাল হয়তো অন্য কোনো এলাকায়। আজ চুলায় গ্যাস নেই, আগামীকাল সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তাই সাময়িকভাবে ট্যাংকার পাঠানো কিংবা সংকটের সময় বিকল্প ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক নগর পরিকল্পনা।

কারণ রাজধানীর মানুষ শুধু শহরে বসবাস করতে চান না—তারা স্বাভাবিক জীবনও চান।

আর সেই স্বাভাবিক জীবনের শুরু একটি সহজ জায়গা থেকেই—

কল খুললে পানি আসবে, চুলায় আগুন জ্বলবে।