ঢাকা, বুধবার ২৬, আগস্ট ২০২৬ ১৫:৪৩:০৩ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

৩০ টাকার টিস্যু কালচারে জারবেরার নতুন বিপ্লব

নিজস্ব প্রতিবেদক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৪০ এএম, ২৬ আগস্ট ২০২৬ বুধবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

আন্তর্জাতিক ফুল বাজারে কাট ফ্লাওয়ার হিসেবে দশটি ফুলের মধ্যে অন্যতম জারবেরা। বাহারি রং, দীর্ঘস্থায়ী সতেজতা এবং নান্দনিক সৌন্দর্যের কারণে বিশ্বের সব দেশেই রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা। এক সময় ফুলটি বিদেশ থেকে আমদানি নির্ভর হলেও বর্তমানে দেশে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে চারা উৎপাদন হওয়ায় স্বল্প খরচে এটি চাষে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের। এতে করে একদিকে যেমন দেশের ফুল শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের ফুলের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, জার্মান উদ্ভিদতত্ত্ববিদ ও চিকিৎসক ট্রগোট জার্বারের নাম থেকে জারবেরা নামের উৎপত্তি। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কদর রয়েছে এই বিদেশি ফুলের। বহুবর্ষজীবী বীরুৎশ্রেণির এ উদ্ভিদটি মাটি, স্থান, খাদ্য ও পরিচর্যা ভেদে এর উচ্চতা প্রায় ৩০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই গাছ দেখতে গুচ্ছাকার বা ঝোপপূর্ণ হয়ে থাকে। এর প্রত্যেকটি কাণ্ডের অগ্রভাগে ফুল ফোটে। ফুল লাল, হলুদ, সাদা কমলা ও গোলাপি রঙের হয়ে থাকে। চারা রোপণের তিন মাসের মধ্যেই ফুল আসে। গাছে থাকা অবস্থায় এক মাসেরও বেশি সময় সতেজ থাকে জারবেরা ফুল। সাধারণত সারা বছরই অল্প পরিমাণ ফুল ফুটলেও এপ্রিল-মে মাসে বেশি ফুল ফোটে। জারবেরা সব ধরনের জলবায়ুতেই কমবেশি জন্মায়। তবে উজ্জ্বল সূর্যের আলোযুক্ত স্থানে লাগালে জারবেরা গাছ খুব ভালো হয় ও এর ফুলও উন্নতমানের হয়। বাংলাদেশে শীতকালে ও শীতের শেষের দিকে এর চাষাবাদ বেশি দেখা যায়। বিশ্বে জারবেরা ৪০টির বেশি প্রজাতি রয়েছে। 

মাদারিপুর হর্টিকালচার সেন্টারের টিস্যু কালচার ল্যাবে গিয়ে দেখা যায়, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত আলোতে কয়েক হাজার কাচের বয়ামের মধ্যে টিস্যু রাখা হয়েছে। যেগুলো স্তরে স্তরে সাজানো। এই টিস্যুগুলো থেকে নিয়ন্ত্রিত আলো ও আবহাওয়ায় গাছের জন্ম নেয়, যা পরে মাঠে বা জমিতে লাগানো হয়। উন্নত জাতের জারবেরার টিস্যু থেকে ল্যাবে উৎপাদিত চারাগুলো সম্পূর্ণভাবে রোগমুক্ত এবং স্বাস্থ্যকর হয়ে থাকে। তাই এগুলো থেকে ভালো মানের ফলন নিশ্চিত করা যায়। 

দেখা গেছে, জারবেরার টিস্যু থেকে উৎপাদিত একটি চারা ধাপে ধাপে বেড়ে ওঠে। তারপর সেটিকে পুষ্টিসমৃদ্ধ কৃত্রিম মিডিয়ার মধ্যে রাখা হয়। সেখানে থাকে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ হরমোন, যা কোষ বিভাজনকে ত্বরান্বিত করে। এই কোষগুলো ধীরে ধীরে বিভাজিত হয়ে তৈরি করে ছোট ছোট মাইক্রো-শুট। এরপর আরেক ধাপে হরমোন ব্যবহার করে তৈরি করা হয় শিকড়। তখন এটি ল্যাবের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মধ্যে গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ চারা। 

ল্যাবের ভেতরে তৈরি হওয়া চারাগুলো সরাসরি মাঠের আবহাওয়ার সাথে খাওয়াতে পারে না। তাই পরবর্তীতে এগুলোকে পলি হাউসে কোকোপিটের ট্রেতে নিয়ন্ত্রিত আর্দ্রতায় রেখে ধাপে ধাপে বাইরের পরিবেশে অভ্যস্ত করা হয়। যখন গাছগুলো শক্ত হয় তখনই সেগুলো কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হয়। 

হর্টিকালচার সেন্টার সূত্র জানায়, এই ফুল বিদেশ থেকে আমদানি করে আনতে প্রতিটি ফুলের পেছনে ৯০ থেকে ১০০ টাকা খরচ পড়ে। আর ল্যাবের মধ্যমে উৎপাদন করার পরে প্রতিটি কাছের চারা ৩০ টাকা করে কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ আমদানিকৃত চারা বা ফুলের তুলনায় খরচ তিন ভাগের এক ভাগ। এ পর্যন্ত মাদারীপুর হর্টিকালচারের টিস্যু ল্যাবে প্রায় ১৮ হাজার চারা তৈরি করা হয়েছে। 

এ বিষয়ে কৃষি কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের সহকারি টিস্যু কালচারিস্ট কৃষিবিদ মো. এনামুল ইসলাম বলেন, জারবেরা এমন একটি ফুল যেটা সারা বছর ফুল দেয়। যা অত্যন্ত মনমুগ্ধকর। একটি গাছ মাঠে কমপক্ষে টানা তিন বছর ফুল দিয়ে থাকে। আর সারা বছরই ফুল দিতে থাকে। ৫ থেকে ৭ দিন এই ফুলের সতেজতা থাকে। এটি সহজে নেতিয়ে পড়ে না। কাচের বোতলে বা পানির মধ্যে ভিজিয়ে রাখলে জারবেরা অনেক দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। তিনি বলেন, এই ফুলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে আমরা এই ল্যাবেই এর চারা তৈরি করছি। আমদানির তুলনায় এখানকার উৎপাদিত চারায় খরচ পড়ে এক-তৃতীয়াংশ। মাত্র ৩০ টাকায় কৃষকের হাতে তুলে দিচ্ছি এই চারা। যশোরের গদখালী, পঞ্চগড়, লালমনিরহাটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমাদের কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করছে। 

এ কৃষিবিদ বলেন, টিস্যু কালচারের চারার সবচেয়ে বড় গুণ মাতৃগাছের হুবহু গুণাগুণ সম্পন্ন এবং সম্পূর্ণ জীবানুমুক্ত চারা। সব কিছু মিলিয়েই জারবেরার প্রতি কৃষকদের চাহিদাটা দিন দিন বাড়ছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত জারবেরা দেশের ফুল শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। একই সঙ্গে দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের ফুলের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি মনে করেন।