ঢাকা, শনিবার ২৯, আগস্ট ২০২৬ ১২:১৪:২০ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

প্রেমকে নিষিদ্ধ করে সমাজ শুদ্ধ করা যায় না

দীপালি হাসান

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৩২ পিএম, ২৮ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

প্রেমের বিরুদ্ধে এবার আইনি নোটিশ! বাংলাদেশের নাটক ও সিনেমায় প্রেম ও রোমান্সের আধিক্য নাকি যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ। তাই প্রেমভিত্তিক নাটক-সিনেমা নির্মাণ ও সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। শুধু তা-ই নয়, এসব কনটেন্টের কারণে নাকি তরুণরা পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়ছে, সামাজিক নৈরাজ্য বাড়ছে, এমনকি পরকীয়া ও ধর্ষণের মতো অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গেও এসব নাটক-সিনেমার সম্পর্ক রয়েছে!

এমন যুক্তি দিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিরক্ষাভিত্তিক চলচ্চিত্র-নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি এখন ঠিক করে দেবে, কোন গল্প বলা যাবে আর কোন গল্প বলা যাবে না?

প্রেম কি এতটাই বিপজ্জনক?

প্রেম কি অপরাধ?

মানুষের সভ্যতার ইতিহাস যত পুরোনো, প্রেমের ইতিহাসও তত পুরোনো। বাংলা সাহিত্য থেকে বিশ্বসাহিত্য—কোথায় নেই প্রেম? রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্য—প্রেম কখনো মানুষের আনন্দ, কখনো বেদনা, কখনো প্রতিবাদ, কখনো আত্মত্যাগ, কখনো সামাজিক সংঘাতের ভাষা হয়েছে।

সিনেমা ও নাটকও সেই সমাজেরই শিল্পরূপ।

তাই কোনো শিল্পমাধ্যমে প্রেমের গল্প বেশি তৈরি হচ্ছে কি না, সেটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। দর্শক বিরক্ত হতে পারেন, নির্মাতাদের সৃজনশীলতার অভাব নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, প্রযোজকের বাণিজ্যিক হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু প্রেমের গল্প তৈরি করাকে প্রায় অপরাধের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে আইনি নিষেধাজ্ঞার দাবি করা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

আজ প্রেমের নাটক বন্ধের দাবি উঠেছে। কাল হয়তো বলা হবে পারিবারিক নাটক তরুণদের আবেগপ্রবণ করে, পরশু বলা হবে রাজনৈতিক সিনেমা সমাজে বিভাজন তৈরি করে। এরপর কোন বিষয় নিষিদ্ধ হবে?

শিল্পের স্বাধীনতার সীমা একবার এভাবে সংকুচিত হতে শুরু করলে তার শেষ কোথায়?

ধর্ষণের দায় সিনেমার?

সবচেয়ে ভয়ংকর যুক্তি হলো—প্রেম, পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের দৃশ্যায়নের সঙ্গে ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের সম্পর্ক স্থাপন করা।

একজন মানুষ ধর্ষণ করে কেন?

কারণ সে একটি নাটক দেখেছে?

নাকি তার মধ্যে নারীর প্রতি ক্ষমতার দৃষ্টিভঙ্গি, যৌন সহিংসতার সংস্কৃতি, অপরাধপ্রবণতা, আইন সম্পর্কে ভয়হীনতা এবং সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক নানা ব্যর্থতা কাজ করে?

ধর্ষণকে যদি কোনো প্রেমের নাটকের দৃশ্যের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে অপরাধের প্রকৃত কারণগুলো আড়াল হয়ে যায়। অপরাধীর দায় সরিয়ে ক্যামেরা, গল্প, অভিনেতা-অভিনেত্রী কিংবা নির্মাতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।

এটি শুধু যুক্তির দুর্বলতা নয়; এটি ভয়ংকরভাবে বিপজ্জনক।

কারণ এতে আমরা ধর্ষকের মানসিকতা, নারীর নিরাপত্তা, বিচারহীনতা, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, ক্ষমতার অপব্যবহার—এসব কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারি।

নৈতিকতার পাহারাদার কে?

নোটিশে ‘নৈতিক অবক্ষয়’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু নৈতিকতার সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করবে?

রাষ্ট্র?

কোনো ব্যক্তি?

কোনো গোষ্ঠী?

নাকি সমাজের মানুষ নিজেরা?

বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকার করেছে; একই সঙ্গে শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধের সুযোগও রেখেছে। কিন্তু সেই বিধিনিষেধের অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্র বা প্রশাসন পছন্দের বিষয়গুলোকে উৎসাহিত করবে আর অপছন্দের গল্পকে নিষিদ্ধ করবে।

শালীনতার নামে শিল্পের বিষয়বৈচিত্র্য কমিয়ে দেওয়া এবং নৈতিকতার নামে মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করা—দুটিই বিপজ্জনক প্রবণতা।

দর্শককে এত বোকা ভাবা কেন?

আরেকটি প্রশ্নও জরুরি—দর্শকের কি নিজের বিচারবুদ্ধি নেই?

একজন তরুণ একটি প্রেমের নাটক দেখলেই সে প্রেমে পড়বে, পড়াশোনা ছেড়ে দেবে কিংবা অপরাধী হয়ে যাবে—এমন ধারণা তরুণ প্রজন্মের প্রতিই এক ধরনের অবিশ্বাস।

একজন দর্শক সিনেমা দেখে কাঁদেন, হাসেন, প্রেমে পড়েন, আবার সিনেমা শেষ করে নিজের বাস্তব জীবনে ফিরে যান।

শিল্প মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করতে পারে—এ কথা সত্য। কিন্তু প্রভাব এবং সরাসরি অপরাধ ঘটানোর কারণ এক জিনিস নয়।

একটি সিনেমা সহিংসতার দৃশ্য দেখালেই সব দর্শক সহিংস হয়ে যান না। যুদ্ধের সিনেমা দেখলেই মানুষ যুদ্ধে যায় না। গোয়েন্দা গল্প পড়লেই কেউ অপরাধী হয়ে ওঠে না। একইভাবে প্রেমের গল্প দেখলেই কেউ নৈতিকভাবে অধঃপতিত হয়ে যায়—এমন সরলীকরণ গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রেমের গল্পেরও সামাজিক মূল্য আছে

প্রেম মানেই শুধু নায়ক-নায়িকার চোখাচোখি নয়।

প্রেম হতে পারে অসম বয়সের সম্পর্কের গল্প। হতে পারে বিধবা নারীর নতুন করে জীবন শুরু করার গল্প। হতে পারে দুই ভিন্ন ধর্ম বা শ্রেণির মানুষের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে সামাজিক বৈষম্য দেখানোর গল্প। হতে পারে সমকামী মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন, হতে পারে নারীর নিজের জীবন বেছে নেওয়ার অধিকার, হতে পারে বিয়ের প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন, হতে পারে প্রতারণা, বিচ্ছেদ, একাকিত্ব কিংবা বার্ধক্যের প্রেম।

অর্থাৎ প্রেম নিজেই একটি বিশাল সামাজিক বিষয়।

তাহলে প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কি ভালো প্রেমের গল্প চাই?

অবশ্যই চাই।

আমরা কি একঘেয়ে, কৃত্রিম, অবাস্তব, অশ্লীল বা দায়িত্বজ্ঞানহীন গল্পের সমালোচনা করব?

অবশ্যই করব।

কিন্তু সমালোচনার পথ হওয়া উচিত আরও ভালো গল্প তৈরি করা, নিষেধাজ্ঞা চাপানো নয়।

সত্যিই যদি নাটক-সিনেমার মান নিয়ে উদ্বেগ থাকে

তাহলে নির্মাতাদের বলুন—বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে সিনেমা বানান। মুক্তিযুদ্ধের অজানা গল্প তুলে আনুন। নদীভাঙনের মানুষের জীবন দেখান। গার্মেন্টসকর্মীদের জীবন নিয়ে নাটক বানান। নারীর সংগ্রাম নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করুন। কৃষকের গল্প বলুন। শ্রমিকের গল্প বলুন। বিজ্ঞানীদের জীবন তুলে ধরুন। শিশুদের স্বপ্ন ও সংকট নিয়ে কাজ করুন। জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, নগরজীবন, মানসিক নিঃসঙ্গতা, বেকারত্ব, দুর্নীতি, বৈষম্য—অসংখ্য বিষয় আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে।

কিন্তু এগুলো তৈরি করার জন্য ‘প্রেমের নাটক নিষিদ্ধ’ করতে হবে কেন?

দর্শককে ভালো কনটেন্ট দিন। দর্শক নিজেই বেছে নেবেন।

সেন্সরশিপ কোনো সৃজনশীল নীতি নয়

রাষ্ট্র যদি সত্যিই চলচ্চিত্র ও নাটকের মান উন্নত করতে চায়, তাহলে প্রয়োজন চলচ্চিত্রশিল্পের শক্তিশালী অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ, অনুদান, গবেষণা, চিত্রনাট্য উন্নয়ন, আর্কাইভ, চলচ্চিত্র শিক্ষা এবং স্বাধীন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।

প্রয়োজন তরুণ নির্মাতাদের সুযোগ দেওয়া।

প্রয়োজন ভালো চিত্রনাট্যকার তৈরি করা।

প্রয়োজন প্রেক্ষাগৃহ বাড়ানো।

প্রয়োজন স্বাধীন চলচ্চিত্রকে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করা।

আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—নির্মাতাকে বিশ্বাস করা এবং দর্শককে সম্মান করা।

নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সৃজনশীলতা তৈরি করা যায় না।

প্রেমকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই

একটি সমাজ তখনই পরিণত হয়, যখন সে প্রেম নিয়ে কথা বলতে পারে, আবার প্রেমের অপব্যবহারেরও সমালোচনা করতে পারে। পরকীয়া নিয়ে গল্প হলে দর্শক তা গ্রহণ করবেন কি না, সেটি দর্শকের সিদ্ধান্ত। ধর্ষণ দেখানো হলে সেটি কীভাবে দেখানো হচ্ছে, সেটি নিয়ে নির্মাতার জবাবদিহি থাকা উচিত। নারীর প্রতি অবমাননাকর উপস্থাপনা হলে তার সমালোচনা হওয়া উচিত।

কিন্তু কোনো একটি বিষয়কে ‘নৈতিক অবক্ষয়ের উৎস’ ঘোষণা করে তার ওপর রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা চাপানোর চিন্তা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে?

আজ প্রেম।

কাল হয়তো কবিতা।

তারপর গান।

তারপর উপন্যাস।

শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে—সৃজনশীলতার জায়গায় কেবল অনুমোদিত গল্পের তালিকা পড়ে আছে।

এমন সমাজ আমরা চাই না।

প্রেমকে নিষিদ্ধ করে নৈতিক মানুষ তৈরি করা যায় না। অপরাধীর দায় সিনেমার ওপর চাপিয়ে সমাজকে নিরাপদ করা যায় না। আর শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করে সৃজনশীল জাতি গড়ে তোলা যায় না।

আমাদের দরকার নিষেধাজ্ঞা নয়—ভালো গল্পের প্রতিযোগিতা।

দর্শককে বোকা ভাবা নয়—দর্শকের রুচি ও বিচারবোধের ওপর আস্থা।

আর শিল্পীকে ভয় দেখানো নয়—শিল্পীকে আরও সাহসী, আরও দায়িত্বশীল এবং আরও সৃজনশীল হওয়ার সুযোগ দেওয়া।

প্রেমের গল্প থাকুক। তবে সেই গল্প যেন শুধু প্রেমে আটকে না থাকে—প্রেমের ভেতর দিয়ে মানুষ, সমাজ ও সময়কে দেখুক।

এটাই হওয়া উচিত আমাদের দাবি।