ঢাকা, সোমবার ৩১, আগস্ট ২০২৬ ১২:১৩:৪৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

বিদ্যুৎ আছে, নাকি নেই—এই ব্যর্থতার দায় কে নেবে?

মানিক নূর

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৬:০৬ পিএম, ৩০ আগস্ট ২০২৬ রবিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

বিদ্যুৎ যেন এখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক অনিশ্চিত অতিথি। কখন আসবে, কখন চলে যাবে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। রাজধানী থেকে গ্রাম, বাসাবাড়ি থেকে কলকারখানা—লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ মানুষ। গরমে অতিষ্ঠ পরিবার, বিদ্যুতের অভাবে থমকে যাচ্ছে উৎপাদন, ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবন। অথচ সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—এত বিদ্যুৎকেন্দ্র, এত উৎপাদনক্ষমতার পরও দেশে বিদ্যুৎ থাকে না কেন?

সরকারি তথ্যই সমস্যার ভয়াবহতা স্পষ্ট করছে। ২৯ আগস্ট বিকেল ৩টায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩২২ মেগাওয়াট, সরবরাহ মাত্র ১২ হাজার ৭১০ মেগাওয়াট—ঘাটতি ৩ হাজার ৬১২ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা ৬টায়ও ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ২৭ মেগাওয়াট। ৩০ আগস্ট ভোররাতেও প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি ছিল।

এখানে একটি নির্মম সত্য সামনে আসে—বাংলাদেশের সমস্যা শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও অবকাঠামোর সংকট। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে আগস্ট ২০২৬-এ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। কিন্তু সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

কেন?

প্রথম এবং প্রধান কারণ গ্যাস সংকট। গ্যাসের অভাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহে ঘাটতি এবং কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি সমস্যা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে একসঙ্গে ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা উঠে এসেছে।

অর্থাৎ, আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করেছি, কিন্তু সেই সক্ষমতা সচল রাখার মতো জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা ও নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো তৈরি করতে পারিনি। এ কেমন পরিকল্পনা?

আরও বড় প্রশ্ন হলো—এতদিন ধরে গ্যাসের সংকটের কথা জানার পরও কেন বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হলো না? কেন বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোর আগে জ্বালানি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা তৈরি করা হলো না? কেন একটি-দুটি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা হলেই জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থা এমনভাবে কেঁপে ওঠে?

সরকার অবশ্য হাত গুটিয়ে বসে নেই। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঢাকায় লোডশেডিং কিছুটা বাড়িয়ে সেই বিদ্যুৎ গ্রামাঞ্চলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস ব্যবহার, মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি এবং সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এগুলো কি আজকের সংকটের সমাধান, নাকি আগামী দিনের পরিকল্পনা? মানুষ তো আগামী কয়েক বছর পর বিদ্যুৎ চায় না; মানুষ আজ বিদ্যুৎ চায়। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আজ দোকানের ফ্রিজ চালাতে চান, একজন কারখানা মালিক আজ উৎপাদন চালু রাখতে চান, একজন শিক্ষার্থী আজ রাতে পড়তে চান, একজন অসুস্থ মানুষ আজ চিকিৎসা নিতে চান।

সরকারের পক্ষ থেকে সংকটের জন্য গ্যাস সরবরাহের সমস্যা, এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি ও বৈরী আবহাওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন যে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দায়িত্বই তো হলো—এই ধরনের ঝুঁকি আগে থেকে অনুমান করে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা।

একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিপাকে পড়বে—এটা কি নতুন কোনো তথ্য? গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ—এটা কি আজ জানা গেল? কয়লা বা তরল জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা হতে পারে—এমন আশঙ্কা কি আগে থেকে ছিল না?

সমস্যা হলো পরিকল্পনার অভাব, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া।

বিদ্যুৎ খাতকে শুধু ‘কত মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা আছে’ দিয়ে বিচার করলে চলবে না। দেখতে হবে, সেই কেন্দ্রগুলো বাস্তবে কতক্ষণ চালানো যাচ্ছে, জ্বালানি কোথা থেকে আসছে, জ্বালানির দাম কত, সঞ্চালনব্যবস্থা কতটা সক্ষম এবং বিতরণব্যবস্থায় অপচয় কতটা। বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে বসিয়ে রাখার কোনো অর্থ নেই।

আরেকটি বিষয়ও সরকারকে কঠোরভাবে বিবেচনা করতে হবে—সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ও এখন সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর কথা বলছে। কিন্তু এই উদ্যোগকে কাগজে-কলমে রেখে দিলে চলবে না। বড় সৌর প্রকল্পের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুৎ এবং ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে।

একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি কমাতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, কয়লা ও জ্বালানি মজুত এবং সঞ্চালনব্যবস্থার সক্ষমতা—সবকিছুকে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখতে হবে।

কারণ বিদ্যুৎ শুধু একটি সেবা নয়; বিদ্যুৎ অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা। বিদ্যুৎ না থাকলে কারখানা চলে না, উৎপাদন কমে, কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়, ব্যবসার খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচ গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে।

তাই ‘পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে’—এ ধরনের আশ্বাস দিয়ে আর দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। জনগণ জানতে চায়, কত দিনে সংকট কাটবে, কোন কেন্দ্রগুলো কেন বন্ধ, কোথায় কত জ্বালানি ঘাটতি, কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব এবং সেই বিদ্যুৎ কেন জাতীয় গ্রিডে আসছে না।

সরকারকে এখনই একটি স্বচ্ছ, সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে। জনগণকে সত্যিটা জানাতে হবে। কোন সংকট সাময়িক, আর কোনটি দীর্ঘমেয়াদি—তা স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে সেইসব সিদ্ধান্তের, যেগুলোর কারণে আজ বিপুল উৎপাদনক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মানুষ অন্ধকারে বসে আছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, উৎপাদনক্ষমতা আছে—তবু বিদ্যুৎ নেই। এর চেয়ে বড় ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার প্রশ্ন আর কী হতে পারে?

মানুষ অন্ধকারে বসে শুধু আলো চায় না; তারা চায় নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, সচল অর্থনীতি এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা। সেই দাবি পূরণ করার দায় সরকারের। এখন সময় আশ্বাসের নয়—ফল দেখানোর।