নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রতীক সাংবাদিক গ্লোরিয়া স্টেইনেম
আইরীন নিয়াজী মান্না
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১২:৪৯ পিএম, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার
যুক্তরাষ্ট্রের নারী অধিকার আন্দোলনের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, লেখক ও নারীবাদী সংগঠক গ্লোরিয়া স্টেইনেম
যুক্তরাষ্ট্রের নারী অধিকার আন্দোলনের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, লেখক ও নারীবাদী সংগঠক গ্লোরিয়া স্টেইনেম আর নেই। ২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সিটিতে নিজের বাড়িতে ৯২ বছর বয়সে মারা যান তিনি। মৃত্যুর সময় প্রিয়জনেরা তার পাশে ছিলেন বলে তার ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তার মৃত্যুর কারণ জানানো হয়নি।
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা ও সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন স্টেইনেম। যুক্তরাষ্ট্রে নারীমুক্তি আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউয়ের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে তিনি নারীর সমঅধিকার, সমান মজুরি, প্রজনন স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নকে মূলধারার রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের আলোচনায় নিয়ে আসেন। তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিশ্বজুড়ে নারী অধিকার আন্দোলনের ভাষা ও কর্মপদ্ধতিতেও তিনি প্রভাব ফেলেছেন।
শৈশবেই বৈষম্যের বাস্তবতা
১৯৩৪ সালের ২৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের টলেডোতে জন্ম গ্লোরিয়া স্টেইনেমের। ছোটবেলায়ই তার জীবনে আসে নানা প্রতিকূলতা। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর অসুস্থ মায়ের দেখাশোনার বড় দায়িত্ব তার ওপর পড়ে।
শৈশবের সেই অভিজ্ঞতা তার চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তী সময়ে নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তার পেছনে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
স্মিথ কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর সাংবাদিকতায় পেশাজীবন শুরু করেন স্টেইনেম। নিউইয়র্কে কাজ করতে গিয়ে দ্রুতই তার লেখার স্বাতন্ত্র্য নজরে আসে।
সাংবাদিকতা থেকেই আন্দোলনের পথে
স্টেইনেমের সাংবাদিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল প্রচলিত বিষয়কে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা। ১৯৬৩ সালে তিনি ছদ্মবেশে প্লেবয় ক্লাবে কাজ করে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনটি তাকে ব্যাপক পরিচিতি দেয়। যদিও পরবর্তী জীবনে তিনি ওই কাজের কিছু দিক নিয়ে অনুশোচনাও প্রকাশ করেছিলেন।
তবে ধীরে ধীরে তার সাংবাদিকতার কেন্দ্রে চলে আসে নারীর জীবন ও অধিকার।
১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রে যখন নারী অধিকার আন্দোলন নতুন শক্তি নিয়ে সামনে আসছে, তখন স্টেইনেম সাংবাদিকতার পাশাপাশি সক্রিয় সংগঠক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৬৯ সালে একটি গর্ভপাতের অধিকারবিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর তার রাজনৈতিক ও সামাজিক সক্রিয়তা আরও গভীর হয়। এরপর নারীর প্রজনন অধিকার, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, যৌন হয়রানি ও নারীর ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে তিনি সরব হয়ে ওঠেন।
‘মিস’ ম্যাগাজিন: একটি পত্রিকা থেকে আন্দোলন
গ্লোরিয়া স্টেইনেমের নামের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে ‘মিস’ ম্যাগাজিন।
১৯৭১ সালে প্রকাশনার উদ্যোগ শুরু হয় এবং পরের বছর পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্টেইনেম ছিলেন এর সহপ্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ‘মিস’ এমন সময়ে প্রকাশিত হয়, যখন নারীদের জন্য প্রকাশিত অধিকাংশ সাময়িকীতে গৃহস্থালি, সৌন্দর্য, পরিবার ও সন্তান পালনের মতো বিষয় প্রাধান্য পেত।
‘মিস’ সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।
নারীর কর্মজীবন, যৌন হয়রানি, গার্হস্থ্য সহিংসতা, বৈষম্য, প্রজনন অধিকার, রাজনীতি এবং সামাজিক ক্ষমতার প্রশ্নকে পত্রিকাটি সামনে নিয়ে আসে। ফলে এটি কেবল একটি ম্যাগাজিন থাকেনি; নারীবাদী সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। ‘মিস’ নিজেও স্টেইনেমকে এমন একজন সাংবাদিক হিসেবে স্মরণ করেছে, যিনি নারীবাদী ধারণা, কণ্ঠ ও আন্দোলনকে মূলধারার আলোচনায় পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
রাজনীতিতেও নারীর অংশগ্রহণের দাবি
শুধু লেখালেখি নয়, রাজনৈতিক পরিসরেও নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে কাজ করেছেন স্টেইনেম।
১৯৭১ সালে তিনি ন্যাশনাল উইমেনস পলিটিক্যাল ককাস গঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরের বছর সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠে। এর লক্ষ্য ছিল নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সরকারি পদে আরও বেশি নারীকে নির্বাচিত হতে সহায়তা করা।
তার বিশ্বাস ছিল, শুধু আইন পরিবর্তন করলেই নারীর অবস্থার পরিবর্তন হবে না; সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোতেও নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও আন্দোলনের অংশ
গ্লোরিয়া স্টেইনেম নারীর প্রজনন অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় নিজের জীবনের একটি কঠিন অভিজ্ঞতাও প্রকাশ্যে এনেছিলেন।
২২ বছর বয়সে লন্ডনে থাকাকালে তিনি গর্ভপাত করান। তখন যুক্তরাজ্যে গর্ভপাতের আইন ছিল অত্যন্ত কঠোর। বহু বছর পর নিজের স্মৃতিকথায় সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তিনি।
এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তার প্রজনন অধিকার আন্দোলনের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে।
১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রো বনাম ওয়েড মামলার ঐতিহাসিক রায়কে তিনি স্বাগত জানান। ওই রায়ে যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছিল।
কিন্তু ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেই রায় বাতিল করে। অর্থাৎ যে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে স্টেইনেম জীবনের কয়েক দশক কাটিয়েছেন, জীবনের শেষ পর্যায়েও সেই অধিকারের বড় একটি আইনি পশ্চাদপসরণ তাকে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে।
শুধু নারীবাদ নয়, বৃহত্তর সামাজিক ন্যায়
স্টেইনেমের আন্দোলন শুধু নারীর অধিকারেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
সমান মজুরি, যৌন বৈষম্যের অবসান, প্রজনন স্বাধীনতা, সমলিঙ্গের মানুষের বিয়ের অধিকার, নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং মৃত্যুদণ্ড বিলোপসহ বিভিন্ন সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
তার রাজনৈতিক চিন্তায় নারী অধিকারকে তিনি বৃহত্তর মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতেন।
এই কারণে তার কর্মকাণ্ড কখনোই শুধু নারীদের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
ছিলেন বিতর্কেরও কেন্দ্রে
যে কোনো বড় সামাজিক আন্দোলনের নেতার মতো স্টেইনেমও সমালোচনার বাইরে ছিলেন না।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, নারীবাদী আন্দোলনের কিছু পর্যায়ে তিনি মধ্যবিত্ত ও শ্বেতাঙ্গ নারীদের অভিজ্ঞতাকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। নারী আন্দোলনের ভেতর থেকেই তার অবস্থান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তার অতীতের একটি অধ্যায়ও দীর্ঘদিন আলোচনায় ছিল—১৯৫০-এর দশকের শেষদিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংগঠনে কাজ করেছিলেন, যার অর্থায়নের সঙ্গে সিআইএর গোপন সম্পৃক্ততার কথা পরে প্রকাশিত হয়। স্টেইনেম নিজে বলেছিলেন, তিনি সিআইএর হয়ে কাজ করছিলেন—এমনটি তিনি জানতেন না। বিষয়টি নিয়ে বহু বছর ধরে বিতর্ক থাকলেও তার পরবর্তী নারীবাদী কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা ও প্রভাবকে তা মুছে দিতে পারেনি।
প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম
যুক্তরাষ্ট্রে নারী অধিকার আন্দোলনে তার দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে গ্লোরিয়া স্টেইনেমকে দেওয়া হয় প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম—দেশটির অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান।
এ সময়ের মধ্যে তিনি শুধু আন্দোলনের একজন কর্মী নন, বরং কয়েক প্রজন্মের নারী অধিকারকর্মীর কাছে একজন পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছিলেন।
তার লেখা বইগুলোর মধ্যে রয়েছে My Life on the Road, Revolution from Within, Moving Beyond Words, Outrageous Acts and Everyday Rebellions এবং The Truth Will Set You Free, But First It Will Piss You Off।
শেষ বয়সেও থামেননি
বয়স বাড়লেও আন্দোলন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি স্টেইনেম।
৮০-এর কোঠাতেও তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলেছেন, লিখেছেন এবং তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করেছেন। শেষ জীবনেও তিনি লেখালেখি ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার ফাউন্ডেশনের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সমতার পক্ষে কাজ করে গেছেন তিনি।
তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক নেতা, অধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বহু মানুষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন তাকে নারী সমতার আন্দোলনের অন্যতম নির্মাতা হিসেবে স্মরণ করেছেন।
একজন সাংবাদিক কীভাবে হয়ে উঠলেন আন্দোলনের প্রতীক
গ্লোরিয়া স্টেইনেমের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো শুধু ‘নারীবাদী’ শব্দটির মধ্যেই আটকে রাখা যায় না।
তিনি দেখিয়েছেন, সাংবাদিকতা কেবল ঘটনা বর্ণনার পেশা নয়; কখনো কখনো সাংবাদিকতা সমাজের অদৃশ্য বৈষম্যকে দৃশ্যমান করার হাতিয়ারও হতে পারে।
তিনি নারীদের জীবনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করেছিলেন। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, যৌন হয়রানি, গর্ভপাত, গার্হস্থ্য সহিংসতা কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতায় নারীর অনুপস্থিতি—এসব বিষয়কে তিনি এমনভাবে সামনে এনেছেন, যা একসময় মূলধারার আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত ছিল।
তার কাজের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তাই কোনো একটি আইন বা একটি প্রতিষ্ঠান নয়। বরং নারীর নিজের জীবন সম্পর্কে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করা।
যে আন্দোলন শেষ হওয়ার নয়
গ্লোরিয়া স্টেইনেম চলে গেলেন। কিন্তু তিনি যে প্রশ্নগুলো সামনে এনেছিলেন, সেগুলোর অনেকগুলো এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রাসঙ্গিক।
নারী কি পুরুষের সমান মজুরি পাবেন? নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার? রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ কতটা? যৌন হয়রানি ও সহিংসতা কীভাবে বন্ধ হবে? পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে নারীর শ্রমের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার লড়াই এখনো চলছে।
আর সেই লড়াইয়ের ইতিহাস লিখতে গেলে গ্লোরিয়া স্টেইনেমের নাম এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
একজন সাংবাদিক হিসেবে শুরু করেছিলেন তিনি। পরে হয়ে উঠেছিলেন আন্দোলনের কণ্ঠ। আর শেষ পর্যন্ত গ্লোরিয়া স্টেইনেম নিজেই পরিণত হয়েছিলেন নারী স্বাধীনতার এক আন্তর্জাতিক প্রতীকে।
