ঢাকা, শনিবার ০৫, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৫২:৫৫ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

অনলাইনে বছরে ২ কোটি শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার

অনলাইন ডেস্ক

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৪:৪১ পিএম, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

বিশ্বের ২১টি দেশে প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি শিশু অনলাইনে যৌন শোষণ ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের ওপর পরিচালিত নতুন এক গবেষণায় এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল—ইউনিসেফের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় একজন শিশু গত এক বছরে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো না কোনো ধরনের যৌন নিপীড়ন বা শোষণের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।

ইউনিসেফ ও অংশীদারদের তৈরি ‘থ্রু চিলড্রেনস আইজ’ শীর্ষক গবেষণায় আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও পূর্ব ইউরোপের ২১টি দেশের প্রায় ২১ হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পরিচালিত জরিপ ও গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনটি অনলাইনে শিশু যৌন নিপীড়নের ব্যাপকতা এবং এর ভয়াবহ মানসিক প্রভাব সম্পর্কে নতুন তথ্য দিয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ শিশু অনিচ্ছাকৃত যৌন কনটেন্টের মুখোমুখি হয়েছে। প্রায় ৯০ লাখ শিশুকে যৌন কথোপকথনে যুক্ত হতে কিংবা যৌন ছবি পাঠাতে চাপ বা বাধ্য করা হয়েছে। আরও প্রায় ৪০ লাখ শিশুর যৌন ছবি তাদের সম্মতি ছাড়াই প্রকাশ বা শেয়ার করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি

শিশুদের যৌন নিপীড়নের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ইউনিসেফের গবেষণা অনুযায়ী, মোট ঘটনার প্রায় ৬০ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে ঘটেছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট ও টিকটকের মতো বহুল ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্মগুলোতে শিশুদের সঙ্গে অপরাধীরা যোগাযোগ স্থাপন করছে এবং ধীরে ধীরে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি কিংবা ভিডিও হাতিয়ে নিয়ে যৌন নিপীড়নের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মও শিশুদের জন্য ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির জায়গা হয়ে উঠছে। গবেষণায় প্রায় ১৪ শতাংশ ঘটনা অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মে ঘটেছে বলে উঠে এসেছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অপরাধীরা সবসময় অচেনা কেউ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩৮ শতাংশ অপরাধীর সঙ্গে শিশুর প্রথম পরিচয় হয়েছিল অনলাইনেই। অর্থাৎ অপরিচিত ব্যক্তি বন্ধুত্ব, গেমিং, চ্যাট কিংবা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে শিশুর আস্থা অর্জন করে পরে তাকে যৌন নিপীড়নের ফাঁদে ফেলেছে।

এআই দিয়ে তৈরি যৌন ছবিও নতুন বিপদ

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে শিশু যৌন নিপীড়নের ধরনও বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে শিশুদের ছবি বিকৃত করে যৌন ছবি বা ভিডিও তৈরি করার ঘটনা নতুন বড় হুমকি হিসেবে সামনে এসেছে।

ইউনিসেফের গবেষণা অনুযায়ী, অন্তত ১১ লাখ শিশু এআই দিয়ে তৈরি যৌন ছবি বা ভিডিওকে কেন্দ্র করে নতুন করে হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ কোনো শিশুর প্রকৃত ছবি ব্যবহার করে তাকে যৌনভাবে উপস্থাপন করা হলেও সেই ছবিটি বাস্তবে ধারণ করা হয়নি—এমন ‘ডিপফেক’ বা কৃত্রিম ছবি দিয়েও এখন শিশুদের ব্ল্যাকমেইল ও হয়রানি করা সম্ভব হচ্ছে। ইউনিসেফ এ ধরনের ঘটনাকে সরাসরি শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের নতুন রূপ হিসেবে দেখছে।

প্রযুক্তির এই অপব্যবহার শিশুদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ একবার কোনো ছবি বা ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে তা পুরোপুরি মুছে ফেলা অত্যন্ত কঠিন। ফলে ভুক্তভোগী শিশুকে দীর্ঘ সময় ধরে অপমান, ভয়, ব্ল্যাকমেইল ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে থাকতে হতে পারে।

চার গুণ বেশি আত্মহত্যার চিন্তা

অনলাইনে যৌন নিপীড়নের প্রভাব শুধু মুহূর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষত তৈরি হতে পারে। ইউনিসেফের গবেষণায় দেখা গেছে, এমন নিপীড়নের শিকার শিশুদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা ও তীব্র মানসিক উদ্বেগের প্রবণতা সাধারণ শিশুদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।

কিন্তু ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও অধিকাংশ শিশু সাহায্য চাইতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ শতাংশেরও বেশি শিশু তাদের অভিজ্ঞতার কথা কাউকেই জানায়নি। আর পুলিশ, সমাজকর্মী বা শিশু সহায়তা হেল্পলাইনে রিপোর্ট করা ঘটনার হার ১ শতাংশেরও কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লজ্জা, ভয়, অপরাধীর হুমকি, পরিবার বা সমাজের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা এবং ‘দোষ শিশুটিরই’—এমন সামাজিক ধারণা অনেক শিশুকে নীরব থাকতে বাধ্য করে। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঘরে বসেই অপরাধীর নাগাল

ইন্টারনেট শিশুদের শিক্ষা, বিনোদন ও যোগাযোগের অসংখ্য সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি অপরাধীদেরও শিশুদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিয়েছে। আগে কোনো শিশুর কাছে পৌঁছাতে অপরাধীকে বাস্তব জীবনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হতো। এখন একটি ভুয়া পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট কিংবা অনলাইন গেমের মাধ্যমে অপরাধী ঘরে বসেই শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।

প্রথমে বন্ধুত্ব, পরে ব্যক্তিগত আলাপ, এরপর ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও চাওয়া—এভাবেই অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ধীরে ধীরে ফাঁদে ফেলা হয়। এক পর্যায়ে সেই ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে শুরু হয় ব্ল্যাকমেইল ও আরও বেশি যৌন কনটেন্ট পাঠানোর চাপ।

ফলে শুধু শিশুদের সচেতন করাই যথেষ্ট নয়; প্ল্যাটফর্মগুলোর নকশা, গোপনীয়তা ব্যবস্থা, বয়স যাচাই, অপরাধী শনাক্তকরণ এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা জরুরি।

ইউনিসেফের আহ্বান

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেছেন, অনলাইনে যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা শিশুদের মানসিক ও আবেগিক জীবনকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু সহায়তার অভাব এবং সামাজিক ভয়ের কারণে অধিকাংশ শিশু নীরবে এই যন্ত্রণা বহন করে।

সংস্থাটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সরকারগুলোর প্রতি শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় আধুনিক আইন প্রণয়ন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো, সহজলভ্য শিশু সহায়তা ব্যবস্থা তৈরি এবং এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা

ইউনিসেফের গবেষণায় বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত ২১টি দেশের তালিকায় রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত না করে এই বৈশ্বিক পরিসংখ্যানকে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট সংখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। তবে বাংলাদেশের শিশু ও কিশোর-কিশোরীরাও দ্রুত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছে। ফলে অনলাইনে শিশু সুরক্ষার প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাকে অনলাইনে নিরাপদ থাকার শিক্ষা দিতে হবে। অভিভাবকদেরও সন্তানের ওপর কেবল নজরদারি নয়, এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে কোনো অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা হলে শিশু ভয় না পেয়ে মা-বাবা বা বিশ্বাসযোগ্য বড়দের কাছে বলতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নিপীড়নের শিকার শিশুকে কখনোই দায়ী করা যাবে না। তার ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তাকে দোষারোপ না করে দ্রুত সহায়তা, আইনি সুরক্ষা ও মানসিক সমর্থন দিতে হবে।

ইউনিসেফের এই গবেষণা মূলত একটি কঠিন বাস্তবতার দিকে বিশ্বকে তাকাতে বাধ্য করছে—শিশুর জন্য ইন্টারনেট যতটা সম্ভাবনার জগৎ, যথাযথ সুরক্ষা না থাকলে ততটাই ভয়ংকর ফাঁদও হতে পারে। প্রযুক্তি থামানো যাবে না, কিন্তু প্রযুক্তির ভেতরে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—সবার।