স্ত্রীকে শিকলে বেঁধে নির্যাতনের ভিডিও পাঠানোর ৩ দিন পর লাশ উদ্ধার
নিজস্ব প্রতিবেদক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১০:৪৩ এএম, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মঙ্গলবার
সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর খিলক্ষেতে স্ত্রীকে শিকলে বেঁধে বেল্ট দিয়ে মারধরের ভিডিও তার ভাইয়ের মোবাইলে পাঠানোর তিন দিন পর মুক্তা ইসলাম মাওয়া (২৫) নামে এক নারীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার স্বামী সোহেল শিকদারকে (৩১) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে মুক্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ৩০ আগস্ট স্ত্রীকে নির্যাতনের একটি ভিডিও তার ভাইয়ের মোবাইলে পাঠান সোহেল। ভিডিওর সঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, তোমার বোনকে নিয়ে যাও।
মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহ ও যৌতুকের দাবিতে কয়েক মাস ধরে তাকে নির্যাতন করছিলেন সোহেল। সর্বশেষ নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করে তার লাশ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন মিনিটের ওই ভিডিওতে মুক্তাকে পায়ে শিকল পরিয়ে খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখতে দেখা যায়। সোহেল বেল্ট দিয়ে তাকে একের পর এক আঘাত করছেন। একপর্যায়ে তার শরীরে কালচে ও রক্তাক্ত জখমের দাগও দেখা যায়।
ভিডিওতে সোহেলকে বলতে শোনা যায়, কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু। তোকে আমি ছাড়ব না। মুক্তা তখন বলেন, আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। এরপরও তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ।
নির্যাতনের সময় মুক্তাকে বলতে শোনা যায়, আমাকে আর মাইরো না, ও আল্লাগো। এ সময় পাশের কক্ষে থাকা তার দুই সন্তান সাফওয়ান (৫) ও তাসফিয়ার (৪) কান্নার শব্দও শোনা যায়। একপর্যায়ে মুক্তা স্বামীকে বলেন, আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি। তবে এতেও নির্যাতন থামেনি বলে অভিযোগ পরিবারের।
ভিডিওটি পাওয়ার পর মুক্তার স্বজনরা তাকে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার ওই বাসায় গিয়ে তারা মুক্তার ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান। পরিবারের দাবি, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই লাশটি সিলিং ফ্যান থেকে নামানো হয়।
এ ঘটনায় গত শুক্রবার খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন মুক্তার ছোট ভাই তানভীর রহমান। এজাহারে বলা হয়েছে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহে মুক্তার ওপর নির্যাতন চালাতেন সোহেল। পাশাপাশি যৌতুকের জন্যও চাপ দেওয়া হতো। সর্বশেষ ৩০ আগস্ট তাকে বেল্ট দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
তানভীর রহমান বলেন, কয়েক মাস আগে আমার কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন সোহেল। সেই টাকা দিতে দেরি হওয়ায় আমার বোনকে মারধর করা হতো।
তিনি আরও বলেন, মাকে হারিয়ে তার দুই বাচ্চা সারা দিন কান্নাকাটি করছে। বারবার বলছে, বাবা মাকে মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে। এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে খিলক্ষেতে স্বামীর সঙ্গে থাকতেন মুক্তা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সোহেল প্রথমে খিলক্ষেত এলাকায় মুদি দোকান চালাতেন। পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসায় যুক্ত হন। সেখানেও ভালো করতে না পারার পর স্ত্রীর সঙ্গে তার অশান্তি বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে শ্বশুরবাড়ির কাছে যৌতুক দাবি শুরু করেন তিনি।
মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন অজুহাতে তাকে মারধর ও নির্যাতন করা হচ্ছিল। সর্বশেষ ৩০ আগস্টের নির্যাতনের পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিন দিন পর তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।
খিলক্ষেত থানার ওসি মুহাম্মাদ সোহরাব আল হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, মুক্তাকে পেটানোর যে ভিডিও পাওয়া গেছে, সেটি তার মৃত্যুর তিন দিন আগের। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে, এটি হত্যা না আত্মহত্যা।
তিনি জানান, এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল শিকদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
