যুক্তরাজ্যের ভাঙন ঠেকানো কঠিন, সিন ফেইনের বার্তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০১:১০ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মঙ্গলবার
সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাজ্যকে একসঙ্গে ধরে রাখতে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম যতই চেষ্টা করুন, দেশটির বিভিন্ন অংশে স্বাধীনতার যে দাবি জোরালো হচ্ছে, তা থামানো কঠিন—এমন বার্তা দিয়েছে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী দল সিন ফেইন। দলটির দাবি, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তা কোনো ব্রিটিশ সরকারের পক্ষেই সহজে আটকে দেওয়া সম্ভব নয়।
সোমবার ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের নেতারা। বৈঠকে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) নেতা জন সুইনি, প্লেইড কামরুর নেতা রুন আপ আইওয়ার্থ এবং সিন ফেইনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও’নিল অংশ নেন। পরে তিন পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে।
সমঝোতা স্মারকে তিন অঞ্চলের জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ওয়েস্টমিনস্টার বা যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারকে সাংবিধানিক পরিবর্তনের পথে বাধা না দিয়ে তা প্রস্তুত ও বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। স্বাধীনতার প্রশ্নে তিন অঞ্চল নিজেদের পরিস্থিতি ও জনগণের মতামত অনুযায়ী আলাদা সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলেও এতে জোর দেওয়া হয়।
মিশেল ও’নিল বলেন, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যে উত্থান দেখা যাচ্ছে, তা থামানোর ক্ষমতা কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর নেই। তাঁর মতে, ওয়েস্টমিনস্টার দীর্ঘদিন ধরে এসব অঞ্চলের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি। ফলে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিন অঞ্চলের মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক এই সমঝোতার রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। ওয়েলসের গত মে মাসের নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড—তিন অঞ্চলেই স্বাধীনতাপন্থী দল নেতৃত্বে রয়েছে। জন সুইনি, রুন আপ আইওয়ার্থ ও মিশেল ও’নিলের এই সমন্বয়কে যুক্তরাজ্যের প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর বাড়তে থাকা চাপের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তিন দলই ভবিষ্যতে স্বাধীনতার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। তবে এতে নতুন কিছু জটিলতার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে ওয়েলস ২০১৬ সালের গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ভবিষ্যতে ওয়েলস স্বাধীন হয়ে ইইউতে যোগ দিলে ইংল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও যাতায়াতে নতুন সীমান্ত তৈরি হওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে।
এর মধ্যেই স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। জন সুইনি সম্প্রতি বার্নহামকে চিঠি দিয়ে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোটের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। বার্নহাম অবশ্য বলেছেন, জনগণের মধ্যে স্পষ্ট ঐকমত্য তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এমন গণভোটের প্রশ্ন নেই।
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অবস্থান নিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, ‘গুড ফ্রাইডে চুক্তি’ অনুযায়ী সেখানে পুনরেকত্রীকরণ নিয়ে গণভোটের সুযোগ রয়েছে, তবে তার আগে জনগণের মতামতে স্পষ্ট পরিবর্তন এবং ঐকমত্যের প্রমাণ থাকতে হবে।
তবে আইরিশ পুনরেকত্রীকরণের আলোচনা সাম্প্রতিক সময়ে নতুন গতি পেয়েছে। গত শনিবার আয়ারল্যান্ড সফরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড দেখতে আগ্রহী এবং ভবিষ্যতে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের একীভূত হওয়াকে স্বাগত জানাবেন। তাঁর এই মন্তব্য যুক্তরাজ্য ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
সিন ফেইন মনে করছে, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তি অনুযায়ী, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জনগণের বড় অংশ যুক্তরাজ্য ছাড়ার পক্ষে অবস্থান নিলে আইরিশ পুনরেকত্রীকরণ নিয়ে গণভোট আয়োজনের সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা, ওয়েলসের স্বায়ত্তশাসন এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের আইরিশ পুনরেকত্রীকরণ—তিনটি প্রশ্নই এখন একই সময়ে যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছে। ফলে বার্নহাম সরকার একদিকে যুক্তরাজ্যের ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে স্বাধীনতাপন্থী শক্তিগুলোও নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াচ্ছে। এই টানাপোড়েনে ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের বর্তমান কাঠামো কতটা অটুট থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ
