সময়ের প্রবাহ: স্বস্তি ও শঙ্কার মাঝখানে বাংলাদেশ
মান্নান সরকার
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ১২:৫১ পিএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার
প্রতীকী ছবি।
একদিকে রাজনৈতিক পর্বে পরিবর্তন, অন্যদিকে অর্থনীতি ও জনজীবনে নানা চাপ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এমন একটি সময় পার করছে, যেখানে স্বস্তি ও শঙ্কা পাশাপাশি হাঁটছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে দেশে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জনজীবনে কিছুটা স্থিতি ফিরেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির কথাও বলছে সরকার। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনো একই—বাজারদর, আয়, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয়।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে আগস্টে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে, যা ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমে হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। তবে একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতায় তার প্রভাব এখনো সীমিত।
বাজারে গেলেই এর বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্যের দামে সাধারণ মানুষকে এখনো হিসাব কষে চলতে হচ্ছে। একটি পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও অন্য কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। ফলে সামগ্রিকভাবে সংসারের ব্যয় কমছে—এমন অনুভূতি অনেকের মধ্যে নেই।
অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রেও রয়েছে মিশ্র বার্তা। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা গেলেও মূল্যস্ফীতি এখনো বড় উদ্বেগ। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি বহিঃখাতকে কিছুটা শক্তি দিয়েছে।
তবে অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জও কম নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের জুলাইয়ের মূল্যায়নে বাংলাদেশের রাজস্ব, ব্যাংকিং খাত ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপের কথা বলা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং আর্থিক খাতে সংস্কার এগিয়ে নেওয়া জরুরি। সংস্কারে অগ্রগতি না হলে প্রবৃদ্ধির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ।
এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবরও এসেছে।
শিল্প খাতের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে পণ্যের দামে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কর্মসংস্থানে। কারখানায় উৎপাদন কমলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি কঠিন হয়, আবার বিদ্যমান কর্মসংস্থানও চাপে পড়ে।
কর্মসংস্থান এখন বাংলাদেশের আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা। বিশেষ করে তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কাজের সুযোগ তৈরি করা না গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার নিয়ে বিভিন্ন মহলের আলোচনায় তাই শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়, কর্মসংস্থান, আয় ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও রয়েছে স্বস্তি ও উদ্বেগের পাশাপাশি অবস্থান। সরকারের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির কথা বলা হয়েছে এবং পুলিশকে আরও কার্যকর করার বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সহনশীলতা ধরে রাখা আগামী দিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে থাকবে।
রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে দেশ। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ অন্তর্বর্তী পর্বের অবসান হয়েছে এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ফিরলেও রাষ্ট্র সংস্কার, প্রশাসনের দক্ষতা, প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশ্নগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ এখন পরিবর্তনের বাস্তব সুফল দেখতে চায়। রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই মানুষের কাছে অর্থবহ হয়ে উঠবে, যখন বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাবে; যখন একজন তরুণ কাজের সুযোগ পাবেন, একজন শ্রমিক নিয়মিত মজুরি পাবেন, একজন ব্যবসায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাবেন এবং একটি পরিবার মাসের বাজার নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় পড়বে না।
বাংলাদেশের সামনে তাই এখন একসঙ্গে কয়েকটি কাজ—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করা, রাজস্ব আয় বাড়ানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও জবাবদিহি বাড়ানো। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলে শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচক ভালো হওয়া সাধারণ মানুষের জীবনকে খুব বেশি স্বস্তি দিতে পারবে না।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে তাই এক কথায় সংকট কিংবা সাফল্য—কোনোটিই বলা যায় না। বরং এটি পরিবর্তনের পর পুনর্গঠনের একটি কঠিন সময়। কিছু সূচকে স্বস্তির ইঙ্গিত আছে, আবার সামনে রয়েছে বড় বড় ঝুঁকি। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে এমন নীতি ও সিদ্ধান্ত, যার সুফল কাগজের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের ঘর পর্যন্ত পৌঁছাবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের পরিস্থিতি বোঝার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি শুধু প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ কিংবা মূল্যস্ফীতির সংখ্যা নয়—সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদে, স্বচ্ছন্দে ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছেন, সেটিই আসল প্রশ্ন।
