ঢাকা, শনিবার ১৯, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮:২২:২৬ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

রাজধানীতে রাস্তা সংস্কারের নামে জনদুর্ভোগ, চলছে ১২ মাস

জোসেফ সরকার

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:৪২ পিএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

রাজধানীর রাস্তা যেন সংস্কার আর খোঁড়াখুঁড়ির অন্তহীন চক্রে আটকে গেছে। কোথাও রাস্তার পিচ উঠে তৈরি হয়েছে খানাখন্দ, কোথাও আবার ভালো রাস্তা কেটে ফেলা হয়েছে পাইপলাইন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিযোগাযোগ কিংবা ড্রেনেজের কাজের জন্য। কাজ শেষ হলেও অনেক জায়গায় দীর্ঘদিন পড়ে থাকছে কাটা অংশ। কোথাও মাটি ফেলে রাখা, কোথাও ইট-বালু স্তূপ করে রাখায় সংকুচিত হয়ে পড়ছে চলাচলের পথ।

ফলে বছরের প্রায় ১২ মাসই কোনো না কোনো এলাকায় রাস্তা সংস্কার, খোঁড়াখুঁড়ি কিংবা ভাঙাচোরা অবস্থার কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী। যানজট, ধুলাবালি, জলাবদ্ধতা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তো আছেই; সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পথচারী, রিকশা-অটোরিকশার যাত্রী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষকে।

এক রাস্তা, বারবার খোঁড়াখুঁড়ি

ঢাকার রাস্তা কাটার অন্যতম বড় কারণ বিভিন্ন সেবাদাতা সংস্থার উন্নয়নকাজ। দুই সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসা, তিতাস গ্যাস, ডেসকো, ডিপিডিসি, বিটিসিএলসহ বিভিন্ন সংস্থা এবং বেসরকারি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন অনুযায়ী রাস্তা কাটে। অতীতে একই রাস্তা এক বছরে একাধিকবার কাটার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, একটি রাস্তা সংস্কার করে যান চলাচলের উপযোগী করার কিছুদিনের মধ্যেই অন্য কোনো সংস্থা এসে সেটি কেটে ফেলে। আবার কাটা রাস্তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে দীর্ঘ সময় চলে যায়।

ফলে যে রাস্তার জন্য এক দফা সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সেটি আবার কাটার পর পুনর্নির্মাণে আরও অর্থ খরচ হচ্ছে। ভোগান্তি পোহাচ্ছেন মানুষ, আর বাড়ছে সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা।

‘কাজ শেষ, রাস্তা পড়ে আছে’

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দেখা যায়, রাস্তার এক অংশ কেটে মাটি সরিয়ে রাখা হয়েছে। কোথাও পাইপ বসানো হলেও ওপরের অংশে পিচ দেওয়া হয়নি। কোথাও কাজ শেষ হলেও নির্মাণসামগ্রী সরানো হয়নি। আবার কোথাও কাটা অংশে মাটি বা খোয়া ফেলে রাখা হলেও তা সমান না হওয়ায় যানবাহন চলাচলে তৈরি হচ্ছে ঝাঁকুনি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

সরেজমিনে নাগরিক বক্তব্য নেওয়ার জায়গা:
মিরপুর/মোহাম্মদপুর/মগবাজার/ধানমন্ডির যে এলাকায় প্রতিবেদনটি করা হবে, সেখানে একজন রিকশাচালক, একজন পথচারী, একজন দোকানি ও একজন নিয়মিত যাত্রীর বক্তব্য নেওয়া যেতে পারে।

রিকশাচালকের কাছে প্রশ্ন:
‘এই রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ির কারণে প্রতিদিন আপনার কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে? ভাড়া বা যাত্রীর সংখ্যা কমেছে কি?’

দোকানির কাছে প্রশ্ন:
‘রাস্তা কাটার পর দোকানের ব্যবসায় কী প্রভাব পড়েছে? কতদিন ধরে এই অবস্থা?’

পথচারীর কাছে প্রশ্ন:
‘হাঁটা বা রাস্তা পার হওয়ার সময় কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে? বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি কী হয়?’

নিয়মিত যাত্রীর কাছে প্রশ্ন:
‘আগের তুলনায় এই পথে যেতে কতটা বেশি সময় লাগছে?’

নীতিমালা আছে, মানা হচ্ছে কতটা?

ঢাকার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে জনদুর্ভোগ কমাতে ‘ঢাকা মহানগরীর সড়ক খনন নীতিমালা-২০১৯’ রয়েছে। নীতিমালায় রাস্তার পুরোটা একসঙ্গে খোঁড়া না করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তা খুঁড়ে না রাখার কথা বলা হয়েছে। খনন করা অংশ ঘিরে রাখা, ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো এবং রাস্তার ওপর নির্মাণসামগ্রী ফেলে না রাখার বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে এসব নির্দেশনার সবগুলো কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটে সড়ক খননের জন্য নির্দিষ্ট অনুমতি প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। আবেদন, সরেজমিন পরিদর্শন, পরিমাপ এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধের পর অনুমতি দেওয়ার বিধান রয়েছে।

অর্থাৎ রাস্তা কাটার জন্য নিয়ম আছে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হচ্ছে মূলত অনুমতি, কাজের সময়সীমা, একাধিক সংস্থার সমন্বয় এবং কাজ শেষে রাস্তা যথাসময়ে পুনর্নির্মাণে।

‘সমন্বয় করেও বাস্তবে হচ্ছে না’

সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির বড় কারণ হিসেবে বারবার উঠে এসেছে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব।

সাম্প্রতিক এক ঘটনায় উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে ডিএনসিসির সংস্কার করা রাস্তা কয়েক মাসের মধ্যেই ওয়াসার ঠিকাদার খুঁড়ে ফেলেন। ডিএনসিসি দাবি করে, রাস্তা খোঁড়ার অনুমতি ছিল না; এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়।

আবার অন্য একটি ঘটনায় ডিএসসিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ওয়াসার কাজ শেষ না হওয়ায় রাস্তা মেরামত করা যাচ্ছে না। যদিও রাস্তা মেরামতের টাকা দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ একটি সংস্থার কাজ শেষ না হওয়ায় অন্য সংস্থার কাজও আটকে থাকছে।

এটাই রাজধানীর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির চক্রের অন্যতম বড় সমস্যা।

কেন এক সংস্থা কাজ শেষ করার পর আরেক সংস্থা আসে?

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সময়সূচিতে সমন্বয় না থাকাই এর অন্যতম কারণ। এক সংস্থা যখন রাস্তা সংস্কার করছে, তখন অন্য সংস্থার ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন বা সেবা সম্প্রসারণের কাজের পরিকল্পনা আগে থেকেই থাকলেও তা একই সময়ে করা হচ্ছে না।

ফলে একটি রাস্তা নতুন করে তৈরি হওয়ার পর আবার সেটি কাটার প্রয়োজন দেখা দেয়।

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদদের একটি বড় প্রস্তাব হলো—সড়ক সংস্কারের আগে ওই সড়কের নিচে কী কী সেবা লাইন রয়েছে এবং ভবিষ্যতে সেখানে কোনো কাজ হবে কি না, তার সমন্বিত পরিকল্পনা করা।

শুধু রাস্তা কাটাই নয়, প্রশ্ন পুনর্নির্মাণেও

নগরবাসীর অভিযোগের বড় অংশ রাস্তা কাটার অনুমতি নিয়ে নয়; বরং কাজ শেষ হওয়ার পর রাস্তা কবে ঠিক হবে, সেটি নিয়ে।

অনেক ক্ষেত্রে রাস্তা কেটে পাইপলাইন বা অন্য অবকাঠামোর কাজ শেষ হলেও পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হতে সময় লাগে। কোথাও ঠিকাদার নিয়োগের অপেক্ষা, কোথাও মূল সংস্থার কাজ শেষ না হওয়া, আবার কোথাও অর্থ বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে রাস্তা পড়ে থাকে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন অবশ্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার রাস্তা কাটার পর পুনর্নির্মাণের জন্য একাধিক দরপত্র দিয়েছে। অর্থাৎ কাটা রাস্তা পুনরুদ্ধারের জন্য সিটি করপোরেশনের পৃথক কাজ ও বরাদ্দ রয়েছে।

তবু নাগরিকদের প্রশ্ন—দরপত্র, ঠিকাদার নিয়োগ ও কাজ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত ভোগান্তির দায় নেবে কে?

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য কী?

প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছ থেকে নির্দিষ্ট এলাকার রাস্তার বিষয়ে বক্তব্য নেওয়া জরুরি।

তাঁকে প্রশ্ন করা যেতে পারে—

১. বর্তমানে সিটি করপোরেশনের আওতায় কতটি সড়ক খোঁড়া অবস্থায় আছে?
২. কতটি রাস্তা সিটি করপোরেশন নিজে এবং কতটি অন্য সংস্থা কেটেছে?
৩. অনুমতি ছাড়া রাস্তা কাটার ঘটনা কতটি পাওয়া গেছে?
৪. রাস্তা কাটার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার না করলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়?
৫. একটি রাস্তা সংস্কারের আগে ওয়াসা, তিতাস, ডেসকো, ডিপিডিসি, বিটিসিএলসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার ভবিষ্যৎ কাজের তথ্য নেওয়া হয় কি না?
৬. একই রাস্তা বারবার কাটার ঘটনা কীভাবে বন্ধ করা হবে?
৭. কাটা রাস্তা দ্রুত সংস্কারে সিটি করপোরেশনের নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে কি না?

ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির বক্তব্যের জন্য প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট প্রধান প্রকৌশলী/অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য যুক্ত করা উচিত।

নগরবাসীর প্রশ্ন—এই ভোগান্তির শেষ কোথায়?

রাজধানীর মানুষের কাছে উন্নয়ন মানে ভালো রাস্তা, নিরাপদ চলাচল ও স্বস্তিদায়ক নগরজীবন। কিন্তু রাস্তা যদি একবার সংস্কার হয়ে আবার কাটা পড়ে, আর কাটা রাস্তা মাসের পর মাস পড়ে থাকে, তাহলে সেই উন্নয়নই নাগরিকের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একজন নগরবাসীর বক্তব্য এমন হতে পারে—

‘রাস্তা উন্নয়ন হবে, কাজ হবে—এটা আমরা চাই। কিন্তু একই রাস্তা বারবার কাটতে হবে কেন? কাজ করার আগে যদি সব সংস্থা নিজেদের কাজের পরিকল্পনা সমন্বয় করে নেয়, তাহলে তো মানুষের এত ভোগান্তি হওয়ার কথা নয়।’

আরেকজনের প্রশ্ন আরও সরল—

‘রাস্তা কাটার সময় সবাই থাকে, কিন্তু রাস্তা ঠিক করার সময় কাউকে পাওয়া যায় না কেন?’

১২ মাসের খোঁড়াখুঁড়ি থেকে মুক্তি কবে?

ঢাকার রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি নতুন কোনো সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে এটি নগরজীবনের পরিচিত চিত্র। নীতিমালা হয়েছে, সমন্বয় সভা হয়েছে, অনুমতি দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে। তারপরও একই সমস্যা ফিরে আসছে।

কারণ, সমস্যা শুধু রাস্তা কাটার অনুমতিতে নয়—সমস্যা পরিকল্পনায়, সমন্বয়ে, কাজের সময়সীমা মানায় এবং জবাবদিহিতে।

একটি রাস্তা কাটার আগে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার কাজের তালিকা সমন্বিত করা, কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, খননস্থলে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা পুনর্নির্মাণ—এই চারটি বিষয় কঠোরভাবে নিশ্চিত করা না গেলে রাজধানীর রাস্তার এই দুর্ভোগ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।

নগরবাসীর প্রশ্ন তাই একটাই—উন্নয়নের জন্য রাস্তা কাটতেই যদি হয়, তবে সেই উন্নয়নের দায়ে নাগরিককে ১২ মাস কেন দুর্ভোগ পোহাতে হবে?