অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের কোথায় দাঁড় করায়
আইরীন নিয়াজী মান্না
উইমেননিউজ২৪
প্রকাশিত : ০৭:২১ পিএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রবিবার
নিহত অপ্রতিম।
একটি শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। মাত্র ১৩ বছরের অপ্রতিম শাহরিয়ার—কুমিল্লার একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে শুক্রবার বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ছেলেটি। তারপর আর ফেরেনি। এক রাতের উৎকণ্ঠা, অপেক্ষা, খোঁজাখুঁজি শেষে শনিবার মিলল তার মরদেহ—লালমাই সানন্দা পাহাড় এলাকার একটি জঙ্গল থেকে।
এই একটি ঘটনা শুধু একটি পরিবারের বুক খালি করে দেয়নি। আমাদের সমাজের আয়নাটাও যেন সামনে এনে ধরেছে।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনায় একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যার পুরো কারণ ও এর সঙ্গে কারা জড়িত, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু যে কারণই শেষ পর্যন্ত সামনে আসুক, একটি প্রশ্ন আমাদের করতেই হবে—একটি মোবাইল ফোনের চেয়েও কি একটি শিশুর জীবনের মূল্য আমাদের সমাজে এত কমে গেছে?
প্রশ্নটি আসলে শুধু মোবাইল ফোনের নয়। প্রশ্ন আমাদের মূল্যবোধের।
একটি শিশু বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিরাপদে ফিরবে—এটুকু নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো সমাজ কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি? স্কুলে যাওয়া, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা, ছবি তোলা, একটু ঘোরাঘুরি করা—একজন কিশোরের এই স্বাভাবিক জীবনযাপনের মধ্যেও যদি মৃত্যুর ভয় লুকিয়ে থাকে, তাহলে আমাদের নিরাপত্তাবোধ কোথায়?
অপ্রতিমের পরিবারের জন্য এই প্রশ্নের কোনো উত্তরই হয়তো যথেষ্ট নয়।
একজন মা তাঁর একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছেন। যে সন্তানকে ঘিরে ছিল তাঁর ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন, প্রতিদিনের ব্যস্ততা, অসংখ্য ছোট ছোট আনন্দ। সেই সন্তানকে হারিয়ে একজন মায়ের মুখ থেকে যখন বেরিয়ে আসে—‘আমি এখন কীভাবে বাঁচব?’—তখন সেটি শুধু একজন মায়ের কান্না থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে একটি সমাজের প্রতি অভিযোগ।
আমরা কি শুনছি সেই অভিযোগ?
অপরাধ যখন মানুষের জীবনের চেয়ে বস্তুগত সম্পদের মূল্যকে বড় করে তোলে, তখন সেখানে শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট থাকে না; থাকে গভীর সামাজিক সংকটও। একটি ফোন, একটি মোটরসাইকেল, কিছু টাকা, সামান্য সম্পদ—এসবের জন্য মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার প্রবণতা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
আর সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এ ধরনের ঘটনায় আমরা প্রায়ই কিছুদিন শোক করি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ করি, বিচারের দাবি তুলি। তারপর নতুন কোনো ঘটনা এসে পুরোনোটিকে আড়াল করে দেয়। নিহত মানুষটি ধীরে ধীরে সংবাদ থেকে হারিয়ে যায়। পরিবারের কান্না থেকে যায় পরিবারের মধ্যেই।
এই বিস্মৃতির সংস্কৃতিও কম বিপজ্জনক নয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা তাই স্বাভাবিক। একজন শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারকে যেন অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াতে না হয়, নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত অনুসন্ধান করা যায়—এমন কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরই সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেও সমস্যার সমাধান হবে না; তবে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অস্বীকার করারও সুযোগ নেই।
একই সঙ্গে আমাদের সমাজকেও নিজের দিকে তাকাতে হবে।
কোন পরিবেশে একটি শিশু বা তরুণ অপরাধের দিকে যায়? কেন অন্যের সম্পদ লুটে নেওয়াকে কেউ সহজ পথ হিসেবে বেছে নেয়? কেন সহিংসতা ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে? পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—প্রত্যেকেরই এসব প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে হবে।
শুধু অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলেই কি সব দায়িত্ব শেষ?
না। অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে। দ্রুত, স্বচ্ছ ও আইনের বিধান অনুযায়ী বিচার হতে হবে। কিন্তু পাশাপাশি অপরাধের সামাজিক শিকড়ও খুঁজতে হবে। কারণ একটি অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন; কিন্তু এমন আরেকজন অপরাধী তৈরি হওয়ার পথ বন্ধ করাও সমান জরুরি।
অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের আরেকটি নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—আমরা অনেক সময় মানুষের দুর্দশার প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলছি। বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করার বদলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। কারও সন্তান নিখোঁজ হলে সেটিকে শুধু ‘অন্যের সমস্যা’ হিসেবে দেখার মানসিকতা একটি সমাজকে ধীরে ধীরে নিষ্ঠুর করে তোলে।
মানবিকতা কোনো বড় বক্তৃতার বিষয় নয়। মানবিকতা হলো বিপদে একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো। একজন নিখোঁজ শিশুর খবর গুরুত্ব দিয়ে দেখা। সন্দেহজনক কিছু দেখলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো। অন্যের সন্তানকেও নিজের সন্তানের মতো নিরাপদ দেখতে চাওয়া।
অপ্রতিমকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। তাঁর মায়ের শূন্যতা কোনো বিচারেই পূরণ হবে না। কিন্তু তাঁর মৃত্যু যদি আমাদের অন্তত কিছু প্রশ্ন করতে বাধ্য করে, তাহলে সেই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
আমরা কেমন দেশ চাই?
যেখানে একটি শিশু বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে রাতে নিরাপদে ঘরে ফিরবে—এটুকু কি খুব বড় প্রত্যাশা?
যেখানে একটি মায়ের সন্তান হারানোর আতঙ্ককে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে—এটুকুই কি আমাদের চাওয়া হতে পারে না?
আর যেখানে মানুষের জীবনের মূল্য একটি মোবাইল ফোনের চেয়ে অসীম বেশি—সেই বোধটুকু কি আমরা আবার ফিরিয়ে আনতে পারি না?
অপ্রতিমের মরদেহ শুধু একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয়নি। তার সঙ্গে আমাদের বিবেকের কাছেও যেন একটি প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে—একটি শিশুকে নিরাপদে বাঁচতে দেওয়ার মতো মানবিক সমাজ কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি?
এই প্রশ্নের উত্তর পুলিশের তদন্তে মিলবে না। আদালতের রায়েও পুরোপুরি মিলবে না। এর উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের প্রত্যেককে—নিজের ভেতরে, পরিবারে, সমাজে এবং রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে।
কারণ অপ্রতিমের মতো আর কোনো শিশুর মরদেহ যেন আমাদের বিবেককে এভাবে জাগিয়ে তুলতে না হয়।
আইরীন নিয়াজী মান্না, সম্পাদক-উইমেননিউজ২৪.কম
