ঢাকা, সোমবার ২১, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১:৩৮:১৮ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

‘দেশের পতাকা দেখলেই অন্যরকম শক্তি পাই’ ঋতুপর্ণা

রাতুল মাঝি

উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:১৭ পিএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রবিবার

ঋতুপর্ণা চাকমা

ঋতুপর্ণা চাকমা

এশিয়ান গেমসে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে জাপানে গেছেন বাংলাদেশের তরুণ খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমা। বড় এই আসর ঘিরে তার প্রস্তুতি, লক্ষ্য, আত্মবিশ্বাস ও দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন— সবকিছু নিয়েই কথা হলো তার সঙ্গে। কথা বলেছেন উইমেননিউজের প্রতিবেদক রাতুল মাঝি।

প্রশ্ন: এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে জাপানে এসে কেমন লাগছে?
ঋতুপর্ণা: দেশের হয়ে এত বড় একটি আসরে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়া সত্যিই আনন্দের। জাপানে এসে নতুন পরিবেশ, নতুন অভিজ্ঞতা—সবকিছুই উপভোগ করছি। তবে আনন্দের পাশাপাশি দায়িত্বটাও অনেক বেশি অনুভব করছি। কারণ এখানে আমি শুধু নিজের জন্য খেলছি না, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছি।

প্রশ্ন: জাপানে পৌঁছানোর পর প্রথম কোন বিষয়টি তোমার নজর কেড়েছে?
ঋতুপর্ণা:
এখানকার শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা খুব ভালো লেগেছে। সবাই নিজের কাজ খুব পরিকল্পনা করে করে। খেলাধুলার পরিবেশটাও দারুণ। এসব বিষয় একজন খেলোয়াড়কে মানসিকভাবে আরও প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।

প্রশ্ন: এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে খেলতে নামার আগে নিজের প্রস্তুতি কীভাবে নিয়েছ?
ঋতুপর্ণা:
অনেক দিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। শারীরিক ফিটনেসের পাশাপাশি টেকনিক ও মানসিক প্রস্তুতির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছি। বড় আসরে একটা ছোট ভুলও অনেক বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। তাই অনুশীলনে প্রতিটি বিষয় খুব মনোযোগ দিয়ে করার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন: প্রতিযোগিতার আগে মানসিক চাপ কাজ করছে?
ঋতুপর্ণা:
চাপ তো থাকেই। তবে আমি চাপটাকে নেতিবাচকভাবে দেখতে চাই না। বরং এটাকে নিজের সেরাটা দেওয়ার অনুপ্রেরণা হিসেবে নিচ্ছি। মাঠে নামার পর চেষ্টা থাকবে স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে।

প্রশ্ন: নিজের শক্তির জায়গা কোনটাকে মনে করো?
ঋতুপর্ণা:
আমি মনে করি, লড়াই করার মানসিকতাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যেতে চাই। পাশাপাশি নিজের দুর্বলতাগুলো নিয়েও নিয়মিত কাজ করছি।

প্রশ্ন: প্রতিপক্ষ সম্পর্কে নিশ্চয়ই আলাদা করে পরিকল্পনা করা হয়েছে?
ঋতুপর্ণা:
অবশ্যই। প্রতিপক্ষের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু প্রতিপক্ষকে নিয়ে ভাবলে হবে না। নিজের খেলাটাও ঠিক রাখতে হবে। আমার লক্ষ্য থাকবে পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলাটা মাঠে বাস্তবায়ন করা।

প্রশ্ন: এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের হয়ে খেলতে নামার অনুভূতিটা কেমন?
ঋতুপর্ণা:
এটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। যখন দেশের পতাকা দেখি, তখন অন্যরকম একটা অনুভূতি হয়। মনে হয়, আমার সঙ্গে পুরো বাংলাদেশ আছে। সেই অনুভূতিটাই আমাকে আরও ভালো করার শক্তি দেয়।

প্রশ্ন: পরিবার তোমাকে কতটা অনুপ্রেরণা দেয়?
ঋতুপর্ণা:
অনেক বেশি। আমি যখন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাই, তখন পরিবারের মানুষগুলোই আমাকে সাহস দেয়। তারা সবসময় বলে, ফল কী হবে সেটা পরে দেখা যাবে—আগে নিজের সেরাটা দাও। এই কথাটা আমার সবসময় মনে থাকে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের নারী খেলোয়াড়দের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে হয়?
ঋতুপর্ণা:
সুযোগ ও ধারাবাহিক সমর্থন খুব গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েদের অনেক সময় খেলাধুলার পাশাপাশি নানা সামাজিক ও পারিবারিক বাধার মধ্য দিয়েও যেতে হয়। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অনেক বদলাচ্ছে। মেয়েরা ভালো করছে, মানুষও তাদের সাফল্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এই জায়গাটা আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার।

প্রশ্ন: একজন নারী খেলোয়াড় হিসেবে কখনো কি মনে হয়েছে, ছেলেদের তুলনায় তোমাদের পথটা কঠিন?
ঋতুপর্ণা:
কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই চ্যালেঞ্জ বেশি। তবে আমি মনে করি, বাধা থাকবেই। সেই বাধাকে অজুহাত না বানিয়ে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যত বেশি ভালো করব, তত বেশি মেয়েদের জন্য পথ তৈরি হবে।

প্রশ্ন: এশিয়ান গেমসে তোমার ব্যক্তিগত লক্ষ্য কী?
ঋতুপর্ণা:
নিজের সেরাটা দেওয়া। অবশ্যই ভালো ফল করতে চাই, দেশের জন্য সাফল্য এনে দিতে চাই। তবে ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করে প্রতিটি মুহূর্তে শতভাগ দেওয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য।

প্রশ্ন: পদক জয়ের স্বপ্ন দেখছ?
ঋতুপর্ণা:
স্বপ্ন তো অবশ্যই আছে। একজন খেলোয়াড় যখন দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নামে, তখন পদকের স্বপ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। আমিও স্বপ্ন দেখি। তবে স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তব প্রস্তুতিটাও থাকতে হবে।

প্রশ্ন: যদি বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে বিজয়ী হও, সেই মুহূর্তটা কেমন হবে বলে মনে হয়?
ঋতুপর্ণা:
(হেসে) সেই মুহূর্তটা নিশ্চয়ই জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হবে। আমি কল্পনা করি, গ্যালারিতে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে, জাতীয় সংগীত বাজছে—এটা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়। এমন একটা মুহূর্তের জন্যই তো এত পরিশ্রম।

প্রশ্ন: খেলার বাইরে জাপানে এসে কী করতে ভালো লাগছে?
ঋতুপর্ণা:
সময় খুব বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। মূল মনোযোগ প্রতিযোগিতায়। তবে সুযোগ পেলে জাপানের সংস্কৃতি, খাবার আর মানুষের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখতে চাই।

প্রশ্ন: খেলোয়াড় হিসেবে তোমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কে?
ঋতুপর্ণা:
আমার অনুপ্রেরণা অনেকেই। যারা প্রতিকূলতার মধ্যেও লড়াই করে সফল হয়েছেন, তাদের গল্প আমাকে অনুপ্রাণিত করে। নিজের দেশের সফল খেলোয়াড়দের দেখেও অনেক কিছু শেখার চেষ্টা করি।

প্রশ্ন: খারাপ সময় বা ব্যর্থতার পর নিজেকে কীভাবে সামলে নাও?
ঋতুপর্ণা:
প্রথমে একটু খারাপ লাগে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু পরে ভুলটা কোথায় হয়েছে সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। খেলাধুলায় ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়। বরং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ফিরে আসাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: তোমার কাছে একজন ভালো খেলোয়াড় হওয়ার অর্থ কী?
ঋতুপর্ণা
: শুধু ভালো পারফরম্যান্স করলেই ভালো খেলোয়াড় হওয়া যায় না। শৃঙ্খলাবোধ, পরিশ্রম, সততা, সতীর্থদের প্রতি সম্মান এবং হার না মানার মানসিকতাও জরুরি।

প্রশ্ন: দেশের তরুণদের জন্য তোমার কী বার্তা?
ঋতুপর্ণা:
মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় নষ্ট না করে খেলাধুলা ও শরীরচর্চার সঙ্গে যুক্ত হওয়া দরকার। শুধু খেলোয়াড় হওয়ার জন্য নয়, সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনের জন্যও খেলাধুলা জরুরি।

প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন—বাংলাদেশের মানুষকে কী বলতে চাও?
ঋতুপর্ণা:
আমাদের জন্য সবাই দোয়া করবেন। আমরা চেষ্টা করব দেশের জন্য ভালো কিছু করতে। মাঠে যখন খেলব, তখন মনে রাখব—আমাদের পেছনে পুরো বাংলাদেশ আছে। সেই ভালোবাসার মর্যাদা রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।